ইরানে মার্কিন-ইসরাইল হামলা, ইউরোপের ভাবনা

ইরান ইস্যুতে ইউরোপের কণ্ঠ এখনো ঐক্যবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তা কাঠামো থেকে বেরিয়ে স্বতন্ত্র অবস্থান নেয়া ইউরোপের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে বৈশ্বিক কূটনীতিতে ইউরোপের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন, প্যারিস (ফ্রান্স)
ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন
ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন |নয়া দিগন্ত

ইরানের পূর্বাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাম্প্রতিক বিমান হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। এর সরাসরি প্রতিক্রিয়া পড়েছে ইউরোপেও। আন্তর্জাতিক আইন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোতে দেখা দিয়েছে গভীর উদ্বেগ।

মঙ্গলবার (৩ মার্চ) জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ইরানের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর বাইরে গেছে বলে মন্তব্য করেন।

ম্যাক্রোঁ হামলাকে ‘যুদ্ধের বিস্ফোরণ’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘এটি দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ফ্রান্স সরাসরি হামলায় অংশ নেয়নি এবং আনুষ্ঠানিক সমর্থনও দেয়নি। তবে আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদারে ফরাসি সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো হচ্ছে।’

তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, ‘ফ্রান্সের বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ চার্লস দ্য গল মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হবে। এর লক্ষ্য হরমুজ প্রণালী, সুয়েজ খাল ও লোহিত সাগরসংলগ্ন নৌপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।’

ইইউ-এর পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কূটনীতিক কাজা ক্যালাস পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘নিরাপত্তা উদ্বেগ থাকলেও এর সমাধান সামরিক পথে নয় বরং টেকসই সমাধান কূটনৈতিক উদ্যোগেই সম্ভব।’

স্পেন প্রকাশ্যে মার্কিন-ইসরাইলি হামলার সমালোচনা করেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলাই এখন সবচেয়ে জরুরি এবং দ্রুত উত্তেজনা প্রশমনে উদ্যোগ নিতে হবে।’

স্পেন সরকার জানায়, তাদের ভূখণ্ডে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ইরান বিরোধী অভিযানে ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়নি। এ অবস্থানের সমালোচনা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পেনকে ‘অবিশ্বস্ত সহযোগী’ আখ্যা দেন এবং ন্যাটো ব্যয় নিয়ে সমালোচনা করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ইস্যুতে ইউরোপের কণ্ঠ এখনো ঐক্যবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তা কাঠামো থেকে বেরিয়ে স্বতন্ত্র অবস্থান নেয়া ইউরোপের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে বৈশ্বিক কূটনীতিতে ইউরোপের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

ইউরোপভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইউরো নিউজ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, সামরিক অভিযানের বিস্তৃতি ইউরোপীয় নেতৃত্বকে কূটনৈতিকভাবে চাপে ফেলেছে। নেতারা পরিস্থিতিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল আখ্যা দিয়ে সংযম ও সংলাপের ওপর জোর দিচ্ছেন।

ইউরোপীয় কমিশন ও ইউরোপীয় কাউন্সিল সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আহ্বান জানিয়েছে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও উদ্বেগ বাড়ছে। ইউরোজোনে জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা দেখা দিলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি ও প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে ইউরোপের সামনে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং রাজনৈতিক ঐক্য বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।