কলিং-এর ফাঁদে অবৈধ বাংলাদেশীরা, আমলে নিচ্ছে না সরকার

পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সংলাপ প্রয়োজন। এর মাধ্যমে অনিয়মিত অবস্থায় থাকা কর্মীদের জন্য বাস্তবসম্মত সমাধান, পুনর্বাসন পরিকল্পনা এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নিয়োগ ব্যবস্থার কাঠামো তৈরি করা জরুরি।

আশরাফুল মামুন, মালয়েশিয়া
কলিং-এর শিকার বাংলাদেশীরা
কলিং-এর শিকার বাংলাদেশীরা |নয়া দিগন্ত

কুয়ালালামপুর—মালয়েশিয়াজুড়ে ইমিগ্রেশন বিভাগের ধারাবাহিক সাঁড়াশি অভিযানে গ্রেফতার আতঙ্কের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা ও দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছেন ভিসাবিহীন বাংলাদেশী লক্ষাধিক কর্মী। দুই বছরের বেশি বৈধতার দাবি জানিয়েও আমলে নিচ্ছে না দু’দেশের সরকার। ফলে একদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের চাপ, অন্যদিকে দেশে পরিবার-পরিজনের ভরণপোষণ ও ঋণের বোঝা—এই দ্বিমুখী সংকটে প্রবাসীদের জীবন ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠছে।

দেশটির ইমিগ্রেশন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ইতিমধ্যে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরলেন লাখ প্রবাসী। এই পরিসংখ্যান মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত অনিয়মিত বাংলাদেশী শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানকেই স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে। তাদের দাবি আগে অবৈধদের বৈধ না করে নতুন করে কলিং ভিসা চালু করলে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশীদের মানবিক সংকট চরম আকার ধারণ করবে।

মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগ জানিয়েছে, অবৈধ অভিবাসীদের জন্য ঘোষিত ‘রিপ্যাট্রিয়েশন প্রোগ্রাম’-এর আওতায় ৫০০ রিঙ্গিত জরিমানা দিয়ে স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সুযোগ ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বহাল থাকবে। তবে নির্ধারিত সময়সীমা ঘনিয়ে এলেও এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অভিবাসী এই সুযোগ গ্রহণ করেননি। ফলে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং প্রতিদিনই নতুন করে আটক হওয়ার ঘটনা ঘটছে। অভিযানে আটককৃতদের বেশির ভাগই বাংলাদেশী। অবৈধদের বৈধকরণের জন্য অন্তঃবর্তী সরকার ও কুয়ালালামপুর বাংলাদেশ দূতাবাস ও মালয়েশিয়ার সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েও দীর্ঘ আড়াই বছরে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। উভয় সরকার কলিং ভিসায় কলিং ভিসায় গুরুত্ব দেয়ায় আবারো সিন্ডিকেট বাণিজ্যে প্রবাসীদের সর্বস্বান্ত হওয়ার নিশ্চিত সম্ভাবনা তৈরী হচ্ছে।

অপরদিকে, ভুক্তভোগী বাংলাদেশী কর্মীদের বড় একটি অংশ দাবি করছেন, তারা বৈধ ভিসা ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় এলেও দেশে ও প্রবাসে সক্রিয় দালাল চক্র এবং অসাধু রিক্রুটিং অ্যাজেন্সির প্রতারণার শিকার হয়েছেন। নির্ধারিত নিয়োগকর্তা বা কোম্পানিতে কাজ না পেয়ে অনেকেই বেকার হয়ে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে অবৈধ অবস্থায় থেকে যান।

মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, অনেক শ্রমিক দীর্ঘদিন ধরে কাজ করলেও নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। আবার কেউ কেউ কাজের সুযোগ না পেয়ে ঋণের বোঝা নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দেশে থাকা পরিবারগুলোর ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, যা সামগ্রিকভাবে একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিচ্ছে।

শ্রমবাজার বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র আইন প্রয়োগের বিষয় নয়; বরং এটি একটি গভীর মানবিক ও নীতিগত সংকট। তারা বলছেন, ২০২২ সালের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখনই যদি কার্যকর নীতিগত সংস্কার ও কঠোর তদারকি নিশ্চিত না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট আরো বড় আকারে ফিরে আসতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সংলাপ প্রয়োজন। এর মাধ্যমে অনিয়মিত অবস্থায় থাকা কর্মীদের জন্য বাস্তবসম্মত সমাধান, পুনর্বাসন পরিকল্পনা এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নিয়োগ ব্যবস্থার কাঠামো তৈরি করা জরুরি।

একই সাথে, দালাল চক্র ও অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, প্রবাসী কর্মীদের অধিকার সুরক্ষা এবং ভবিষ্যৎ শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও সময়ের দাবি।

পর্যবেক্ষকদের মতে, দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত হাজারো বাংলাদেশী শ্রমিক আরো গভীর অনিশ্চয়তা ও মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারেন।