প্যারিসে তিনটি উন্মুক্ত সাঁতার কেন্দ্র চালু

নদীতীরে ইতোমধ্যে ভাসমান প্ল্যাটফর্ম, পোশাক পরিবর্তনের কক্ষ, লকার, শাওয়ার, বিশ্রাম এলাকা এবং নিরাপত্তা অবকাঠামোর কাজ প্রায় শেষ হয়েছে।

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন, প্যারিস (ফ্রান্স)
উন্মুক্ত সাঁতার কেন্দ্র
উন্মুক্ত সাঁতার কেন্দ্র |নয়া দিগন্ত

গত বছরের ব্যাপক সাফল্যের ধারাবাহিকতায় চলতি গ্রীষ্মেও ঐতিহাসিক সেন নদীতে জনসাধারণের জন্য তিনটি উন্মুক্ত সাঁতার কেন্দ্র চালু করছে প্যারিস সিটি কর্তৃপক্ষ। আগামী ৪ জুলাই থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত আইফেল টাওয়ারের কাছের গ্রেনেল, সিটি হলের নিকটবর্তী ব্রা মারি এবং কুয়ে দ্য বেরসি এলাকায় প্রতিদিন বিনামূল্যে সাঁতার কাটার সুযোগ পাবেন বাসিন্দা ও পর্যটকরা।

সরকারি তথ‍্যমতে, ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে দীর্ঘ এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো সেন নদীতে জনসাধারণের জন্য সাঁতার চালু করা হয়। সে সময় প্রায় এক লাখ মানুষ এই সুযোগ গ্রহণ করেন। ব্যাপক জনসমাগম ও ইতিবাচক সাড়ার কারণে এবার আরো উন্নত ব্যবস্থাপনায় একই উদ্যোগ পুনরায় বাস্তবায়ন করছে প্যারিস সিটি করপোরেশন।

নদীতীরে ইতোমধ্যে ভাসমান প্ল্যাটফর্ম, পোশাক পরিবর্তনের কক্ষ, লকার, শাওয়ার, বিশ্রাম এলাকা এবং নিরাপত্তা অবকাঠামোর কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। গত বছরের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এবার সাঁতারের সময়সূচিও বাড়ানো হয়েছে, যাতে আরো বেশি মানুষ সুবিধাটি উপভোগ করতে পারেন।

বিশেষ করে ব্রা মারি এলাকায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। গত বছর নৌযান চলাচলের কারণে সেখানে কেবল সকালে সাঁতার কাটার অনুমতি ছিল। এবার সাঁতারের নির্ধারিত অংশটি লুই-ফিলিপ সেতুর দিকে কিছুটা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ কাঠের পাইলিং বা ‘ডুক-দাল্ব’ স্থাপন করা হয়েছে। ফলে এই কেন্দ্রটি এবার সারাদিন খোলা থাকবে।

প্যারিসের উপ-মেয়র আঁতোয়ান গিয়ু জানান, এ বছর সাঁতারের নিয়ম আরো সহজ ও অভিন্ন করা হয়েছে। এখন থেকে কমপক্ষে ১ দশমিক ২০ মিটার উচ্চতার যে কেউ সাঁতার কাটতে পারবেন। বয়সের পরিবর্তে এটিই একমাত্র যোগ্যতার মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ১৪ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোরদের অবশ্যই একজন প্রাপ্তবয়স্ক অভিভাবকের সাথে থাকতে হবে। নিরাপত্তার স্বার্থে তিনটি কেন্দ্রেই লাইফ বয়া ব্যবহার বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছে।

সেন নদীর পানির মান নিয়ে অতীতে নানা উদ্বেগ থাকলেও নগর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এবারও প্রতিদিন পানির গুণগত মান পরীক্ষা করা হচ্ছে। জুন মাস থেকেই দৈনিক নমুনা সংগ্রহ শুরু হয়েছে। প্যারিসের পরিচ্ছন্নতা ও পয়ঃনিষ্কাশনবিষয়ক উপ-মেয়র পিয়ের লোম্বার জানান, পরীক্ষার সময় মাত্র দুই দিন পানির মান সাঁতারের জন্য উপযুক্ত ছিল না। তার ভাষায়, প্যারিস অলিম্পিক উপলক্ষে গৃহীত বৃহৎ অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল এখন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।

এসব উন্নয়নের মধ্যে রয়েছে রাজধানীর উজানে দু’টি পানি শোধনাগার আধুনিকীকরণ, ভারী বৃষ্টির সময় অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণের জন্য বিশাল জলাধার নির্মাণ, ব্যক্তিমালিকানাধীন পয়ঃনিষ্কাশন সংযোগ আধুনিক মানে উন্নীত করা এবং নদীতে দূষণ কমাতে ব্যাপক ব্যবস্থা গ্রহণ। পাশাপাশি নগর কর্তৃপক্ষের বিশেষ দল নিয়মিত নদীতীর পরিদর্শন করবে, যাতে কোনো ধরনের তেল বা জ্বালানি দূষণ না ঘটে এবং নদীতে নোঙর করা প্রায় ৩০০টি নৌযান সঠিকভাবে নগরীর পয়ঃনিষ্কাশন নেটওয়ার্কের সাথে সংযুক্ত রয়েছে কি না তা নিশ্চিত করা যায়।

এবার তিনটি সাঁতার কেন্দ্রের ধারণক্ষমতাও নির্ধারণ করা হয়েছে। গ্রেনেল কেন্দ্রে একসাথে ২০০ জন, যার মধ্যে ১৫০ জন সাঁতারু, ব্রা মারি কেন্দ্রে ১৫০ জন সাঁতারু এবং বেরসি কেন্দ্রে সর্বোচ্চ ৬০০ জন, যার মধ্যে ৩০০ জন সাঁতারু, প্রবেশ করতে পারবেন।

সময়সূচি অনুযায়ী গ্রেনেল কেন্দ্র প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত খোলা থাকবে। তবে ৪ থেকে ৮ আগস্ট ইউরোপীয় ওপেন ওয়াটার সুইমিং ও হাই ডাইভিং চ্যাম্পিয়নশিপ উপলক্ষে এটি সাময়িকভাবে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ থাকবে। ব্রা মারি কেন্দ্র প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এবং বেরসি কেন্দ্র সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।

এছাড়া গ্রীষ্মকালীন কর্মসূচির অংশ হিসেবে কানাল সাঁ-মার্তাঁ এলাকায় প্রতি রোববার দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এবং লা ভিলেত জলাশয়ে প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত বিনামূল্যে সাঁতার কাটার সুযোগ থাকবে।

প্যারিস সিটি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভবিষ্যতে ইউরোপে তাপপ্রবাহের মাত্রা আরো বাড়তে থাকলে সাঁতার কেন্দ্রগুলো আরো আগে চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বাস্তিল স্কয়ারের পাদদেশে বাসাঁ দ্য লারসেনাল এলাকায় নতুন একটি উন্মুক্ত সাঁতার কেন্দ্র গড়ে তোলার বিষয়েও চিন্তাভাবনা চলছে।

পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং নগরবাসীর জন্য উন্মুক্ত বিনোদনের সুযোগ বাড়ানোর অংশ হিসেবে সেন নদীকে পুনরায় সাঁতারের উপযোগী করে তোলার এই উদ্যোগকে প্যারিসের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম সফল নগর প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।