ফ্রান্সের পৌর নির্বাচনে প্রথম দফায় এলএফই-এর চমক

রোববার দেশজুড়ে ৩৪ হাজার ৮৭৫টি কমিউন বা শহরে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৫৬ শতাংশ।

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন, প্যারিস (ফ্রান্স)
নির্বাচনে এলএফই-এর চমক
নির্বাচনে এলএফই-এর চমক |নয়া দিগন্ত

ফ্রান্সের ২০২৬ সালের পৌর নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে।

রোববার (১৫ মার্চ) দেশজুড়ে ৩৪ হাজার ৮৭৫টি কমিউন বা শহরে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৫৬ শতাংশ।

এ হার ২০২০ সালের নির্বাচনের তুলনায় বেশি হলেও ২০১৪ সালের তুলনায় কিছুটা কম।

প্রথম দফার ফলাফলে ফরাসি রাজনীতিতে নতুন ভারসাম্যের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। জঁ লুক মেলনশোর অতি বাম রাজনৈতিক দল লা ফ্রঁন্স আনসুমিজ (এলএফই) এবং মারিন লো পেনের কট্টর ডান দল ন্যাশনাল র‍্যালী (আরএন) কয়েকটি শহরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। অন্যদিকে পরিবেশবাদী দল ইকোলোজিস্ট বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শহরে চাপে পড়েছে।

নির্বাচনের দ্বিতীয় দফা অনুষ্ঠিত হবে আগামী রোববার (২২ মার্চ)।

বড় শহরগুলোতে অনিশ্চয়তা :
ফ্রান্সের কয়েকটি বড় শহরে প্রথম দফার ফলাফল অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে এবং দ্বিতীয় দফার ফলাফল নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।

রাজধানী প্যারিসে ফরাসি সোশ্যালিস্ট পার্টি (পিএস) ও বাম দলগুলোর জোটের প্রার্থী এমানুয়েল গ্রেগোয়া প্রথম দফায় এগিয়ে রয়েছেন প্রায় ৩৭.৯ শতাংশ ভোট নিয়ে।

ডানপন্থী লে রিপাবলিকান (এলআর) সমর্থিত প্রার্থী রাশিদা দাতি পেয়েছেন প্রায় ২৫.৫ শতাংশ ভোট।

অন্যদিকে এলএফই-এর প্রার্থী সোফিয়া শিকিরু প্রায় ১২ শতাংশ ভোট নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছেন এবং দ্বিতীয় দফার আগে বামপন্থী জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। ফলে প্যারিসে তিন প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ফ্রান্সের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর লিয়োঁতেও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যাচ্ছে। পরিবেশবাদী দলের বর্তমান মেয়র গ্রেগরি দুশে এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী জ্যঁ-মিশেল আউলাস উভয়েই ৩৬.৮ শতাংশ ভোট পেয়ে সমানে সমানে রয়েছেন।

মার্সেই শহরে সোশ্যালিস্ট পার্টির বর্তমান মেয়র বেনোয়া পায়াঁ সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন কট্টর ডান আরএন-এর প্রার্থী ফ্রঁ আলিসিওর বিরুদ্ধে। তাদের ভোটের ব্যবধান যথাক্রমে প্রায় ৩৫.৬ শতাংশ এবং ৩৫.১ শতাংশ।

লিল শহরেও প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে। সেখানে সোশ্যালিস্ট পার্টির প্রার্থী অল্প ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও এলএফই-এর প্রার্থী খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছেন। পরিবেশবাদী দল সেখানে তৃতীয় স্থানে রয়েছে।

এলএফই-র উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি :
প্রথম দফার নির্বাচনে অতি বাম রাজনৈতিক দল লা ফ্রঁন্স আনসুমিজ (এলএফই) উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। দলটির নেতারা এটিকে তাদের জন্য বড় রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন।

দলটির নেতা জঁ লুক মেলনশো ফরাসি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পরিচিত একটি নাম। তার তীব্র মার্কিন ও ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান এবং চীন ও রাশিয়ার প্রতি তুলনামূলক সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে মূলধারার রাজনীতিতে কিছুটা অস্বস্তিও রয়েছে।

উত্তর ফ্রান্সের রুবে শহরে এলএফই-এর প্রার্থী ডেভিড গিরো প্রায় ৪৬ শতাংশ ভোট পেয়ে স্পষ্টভাবে এগিয়ে রয়েছেন এবং দ্বিতীয় দফায় জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

উত্তর প্যারিসের আলোচিত শহর সেন্ট-দেনিতে এলএফই শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে এবং সেখানে প্রথম দফাতেই তাদের পুরো প্যানেল বিজয় অর্জন করেছে। দলটির নেতৃত্বে দ্বিতীয় দফায় ডানপন্থী ও কট্টর ডান শক্তিকে ঠেকাতে একটি ‘অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট কোয়ালিশন’ গঠনের আহ্বান জানিয়েছে।

পিএস ও এলএফই জোট নিয়ে মতবিরোধ :
তবে সোশ্যালিস্ট পার্টি (পিএস) জাতীয় পর্যায়ে এলএফই-এর সাথে জোট করার ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছে।

দলটির নেতৃত্বের মতে, এলএফই বামপন্থীদের নেতৃত্ব দিয়ে বিজয়ের পথে নিয়ে যেতে সক্ষম নয়। ফলে জাতীয় পর্যায়ে তাদের সাথে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা হবে না বলে তারা জানিয়েছে।

পরিবেশবাদীদের চ্যালেঞ্জ :
২০১৯–২০ সময়ে ফ্রান্সে ‘সবুজ ঢেউ’ তৈরি করেছিল পরিবেশবাদী দল ইকোলোজিস্ট। কিন্তু এবারের নির্বাচনে বেশ কয়েকটি শহরে তারা কঠিন অবস্থায় পড়েছে।

জার্মান সীমান্তবর্তী স্ট্রাসবুর্গ শহরের বর্তমান পরিবেশবাদী মেয়র প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছেন। বোর্দো শহরে পরিবেশবাদী প্রার্থী এগিয়ে থাকলেও ব্যবধান খুবই কম। আর লিল শহরে তারা তৃতীয় স্থানে নেমে গেছে।

ডানপন্থীদের অবস্থান :
ডানপন্থী লে রিপাবলিকান (এলআর) নেতৃত্ব দ্বিতীয় দফার আগে ‘ডানপন্থীদের বড় ঐক্য’ গঠনের আহ্বান জানিয়েছে।

তাদের মতে, বামপন্থী জোট এবং কট্টর ডান ন্যাশনাল র‍্যালী -এর (আরএন) বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে প্রজাতন্ত্র পন্থী ডানপন্থীদের ঐক্য জরুরি।

অন্যদিকে আরএনও দ্বিতীয় দফার আগে ডানপন্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সাথে সমঝোতার আহ্বান জানিয়েছে।

ফ্রান্সে পৌর নির্বাচনের ভোট পদ্ধতি :
ফ্রান্সে পৌর নির্বাচনে ভোটাররা সরাসরি মেয়র বা কাউন্সিলর প্রার্থীদের ব্যক্তিগতভাবে ভোট দেন না।

নাগরিকরা সাধারণত একটি পূর্ণাঙ্গ প্রার্থী তালিকার পক্ষে ভোট দেন। এই তালিকা সাধারণত মেয়র প্রার্থীর নেতৃত্বে তৈরি করা হয় এবং এতে কাউন্সিলরসহ একাধিক প্রার্থী থাকেন।

প্রতিটি তালিকা যে পরিমাণ ভোট পায় তার অনুপাতে পৌর পরিষদের আসন বণ্টন করা হয়। এরপর নির্বাচিত কাউন্সিলররা নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে মেয়র হিসেবে নির্বাচন করেন।

নির্বাচনে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূতদের অংশগ্রহণ :
মেয়র পদে কোনো বাংলাদেশী প্রার্থী না থাকলেও এবারের নির্বাচনে বৃহত্তর প্যারিসের বিভিন্ন শহরে অনেক বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ফরাসি নাগরিক প্রার্থী হয়েছেন।

তাদের মধ্যে নাহিদুল মোহাম্মদ উত্তর প্যারিসের সেন্ট-দেনি শহর থেকে এলএফই দলের প্যানেল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের প্যানেল প্রথম দফাতেই ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে বিজয় অর্জন করায় সেখানে দ্বিতীয় দফার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে না।

নাহিদুল বর্তমানে প্যারিসের সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। তার পৈত্রিক নিবাস বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ জেলায়।

তিনি বলেন, ‘ফ্রান্সের স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের অভিবাসী বংশোদ্ভূত নাগরিকদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। এই নির্বাচনে বিজয় আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা। এটি স্থানীয় সমাজে বাংলাদেশী কমিউনিটির উপস্থিতিকে আরো দৃশ্যমান করবে।’

ভোটার উপস্থিতি :
প্রথম দফায় ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৫৬ শতাংশ। এটি ২০২০ সালের মহামারিকালীন নির্বাচনের তুলনায় বেশি হলেও ২০১৪ সালের তুলনায় কম।

তবে প্যারিস, লিয়োঁ ও স্ট্রাসবুর্গের মতো বড় শহরে ভোটারদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।

সব মিলিয়ে প্রথম দফার ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ২২ মার্চের দ্বিতীয় দফায় ফ্রান্সের অনেক বড় শহরে রাজনৈতিক লড়াই আরো তীব্র হতে পারে এবং চূড়ান্ত ফলাফল এখনো পুরোপুরি অনিশ্চিত।