ফ্রান্সের কর প্রশাসনে নজিরবিহীন সাইবার হামলা

প্রায় ছয় লাখ ৭৮ হাজার মানুষের তথ্য এই ঘটনার আওতায় পড়েছে। চুরি হওয়া তথ্যের মধ্যে কর-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য এবং নাগরিকদের পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম এমন তথ্য রয়েছে।

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন, প্যারিস (ফ্রান্স)
ফ্রান্সের কর প্রশাসনে সাইবার হামলা
ফ্রান্সের কর প্রশাসনে সাইবার হামলা |নয়া দিগন্ত

ফ্রান্সের কর প্রশাসন বা ডিরেকশন জেনেরাল দে ফিনান্স পাবলিক বড় ধরনের সাইবার হামলার শিকার হয়েছে। দেশটির অর্থ ও অর্থনীতি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জুন মাসে কর প্রশাসনের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থায় অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করে ব্যক্তি ও পেশাজীবীদের তথ্য দেখা এবং সংগ্রহ করা হয়েছে। হামলায় অন্তত ছয় লাখ ৭৮ হাজার ব্যবহারকারীর সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কাছে ঘটনাটি ফ্রান্সের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম গুরুতর সরকারি সাইবার হামলা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সুইজারল্যান্ডের সংবাদপত্র ‘লে তঁ’ ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুতর হিসেবে বর্ণনা করেছে। পত্রিকাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের সরকারি প্রশাসন থেকে তথ্য ফাঁসের দীর্ঘ তালিকার মধ্যেই নতুন এই ঘটনা সামনে এসেছে। সংবাদপত্রটির ভাষ্য অনুযায়ী, এটি একটি ‘নজিরবিহীন’ সাইবার হামলা, যার ব্যাপ্তি ও প্রভাব নিয়ে ফরাসি প্রশাসনের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ফরাসি অর্থ ও অর্থনীতি মন্ত্রণালয় ১৩ আগস্ট জানায়, জুন মাসে ‘দে ঝে এফ ই পি’ এর ব্যবস্থায় একটি ‘অবৈধ প্রবেশ’ শনাক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে ব্যক্তি ও পেশাজীবীদের বিভিন্ন তথ্য দেখা এবং সিস্টেম থেকে বের করে নেয়া সম্ভব হয়েছিল। তদন্তে পরে জানা যায়, প্রায় ছয় লাখ ৭৮ হাজার মানুষের তথ্য এই ঘটনার আওতায় পড়েছে। চুরি হওয়া তথ্যের মধ্যে কর-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য এবং নাগরিকদের পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম এমন তথ্য রয়েছে।

ফরাসি কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, হামলাকারীরা কোনো সাধারণ প্রযুক্তিগত ত্রুটি কাজে লাগানোর পরিবর্তে একজন কর্মী ও অনুমোদিত তৃতীয় পক্ষের ব্যবহৃত পরিচয়পত্রের অপব্যবহার করে সিস্টেমে প্রবেশ করেছিল। অর্থাৎ, হামলাকারীদের হাতে বৈধ প্রবেশাধিকারসংক্রান্ত তথ্য চলে যাওয়ায় তারা সরকারি ব্যবস্থার ভেতরে ঢোকার সুযোগ পায়। এই পদ্ধতি সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের কাছে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ বৈধ পরিচয় ব্যবহার করে পরিচালিত আক্রমণ শনাক্ত করা তুলনামূলকভাবে কঠিন।

দে ঝে এফ ই পি-এর মহাপরিচালক আমেলি ভার্দিয়ে জানিয়েছেন, এবারের হামলাটি আগের কয়েকটি সাইবার হামলার তুলনায় বেশি অত্যাধুনিক ছিল। হামলার সাথে জড়িত অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করার পর সেগুলোর প্রবেশাধিকার বন্ধ করা হয়। তবে প্রাথমিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তথ্য চুরি হয়ে যাওয়ার বিষয়টি ধরা পড়েনি। পরে আরো গভীর তদন্তের মাধ্যমে তথ্য দেখা ও সংগ্রহের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। ঘটনাটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সাইবার নজরদারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

‘জিরো বাইটস’ নামে পরিচিত এক হ্যাকার বা হ্যাকার গোষ্ঠী এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। তারা দাবি করেছে, দে ঝে এফ ই পি-এর সিস্টেমে ঢুকে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। হ্যাকারদের পক্ষ থেকে চুরি করা তথ্য বিক্রির দাবিও করা হয়েছে। তবে এসব দাবির সবকিছু স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে চুরি হওয়া তথ্য বাস্তবে কতটা অন্যের হাতে গেছে এবং কীভাবে ব্যবহার করা হতে পারে, তা নিয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

‘জিরো বাইটস’ একই সাথে জুলাইয়ের শেষ দিকে ফরাসি কর প্রশাসনের বিরুদ্ধে আরো একটি হামলার দাবি করেছে। ওই হামলায়ও বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ করার দাবি জানানো হয়। এর ফলে ফরাসি কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি আরো উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। একই গোষ্ঠী ফ্রান্সের অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও হামলার দাবি করায় দেশটির সরকারি ডিজিটাল অবকাঠামো নিয়ে নতুন করে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি হয়েছে।

ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু ১৭ আগস্ট একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সঙ্কট বৈঠক আহ্বান করেন। বৈঠকে সরকারি প্রশাসনের সাইবার নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। গত ৩০ এপ্রিল প্রশাসনের সাইবার নিরাপত্তা জোরদারের জন্য যে পরিকল্পনা চালু করা হয়েছিল, সেটির বাস্তবায়ন পরিস্থিতিও বৈঠকে আলোচনায় আসে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সরাসরি বিষয়টি তদারকি করার ঘটনা থেকেই বোঝা যায়, হামলাটিকে ফরাসি প্রশাসন কতটা গুরুত্বের সাথে দেখছে।

এদিকে প্যারিসের প্রসিকিউটর অফিসের সাইবার অপরাধ বিভাগ ঘটনাটি নিয়ে ফৌজদারি তদন্ত শুরু করেছে। প্রতারণামূলকভাবে তথ্য সংগ্রহ এবং অপরাধমূলক চক্র গঠনের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ফরাসি সাইবার নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষও তদন্তে যুক্ত রয়েছে। তদন্তকারীরা হামলাকারীরা কীভাবে সিস্টেমে প্রবেশ করেছিল, কত সময় ধরে তারা সেখানে সক্রিয় ছিল এবং ঠিক কোন কোন তথ্য সংগ্রহ করেছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখছেন।

চুরি হওয়া তথ্য সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য না হলেও তা ভবিষ্যতে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কর-সংক্রান্ত তথ্য ও ব্যক্তিগত পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করে অপরাধীরা নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে ভুয়া ই-মেইল, ফোনকল বা বার্তা পাঠাতে পারে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বা কর বিভাগের পরিচয় দিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য, পাসওয়ার্ড কিংবা অর্থ হাতিয়ে নেয়ার মতো প্রতারণার ঝুঁকিও রয়েছে। ফলে আক্রান্ত নাগরিকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে আরো উঠে এসেছে, ফ্রান্সের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিকভাবে সাইবার হামলা ও তথ্য ফাঁসের মুখে পড়ছে। জার্মানির ‘ফ্রাঙ্কফুর্টার আলগেমাইনে জাইটুং’ ঘটনাটিকে ফ্রান্সের সরকারি ডিজিটাল অবকাঠামোর জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, কর প্রশাসনের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি প্রতিষ্ঠানের তথ্যভান্ডারে হামলা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সাইবার নিরাপত্তার দুর্বলতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

ফ্রান্সের জন্য এই ঘটনার গুরুত্ব শুধু ছয় লাখ ৭৮ হাজার মানুষের তথ্য চুরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কর প্রশাসনের কাছে নাগরিকদের আয়, পারিবারিক পরিস্থিতি, কর প্রদান এবং বিভিন্ন আর্থিক বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকে। এসব তথ্য একত্রে ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পাওয়া সম্ভব। ফলে তথ্যগুলো অপরাধীদের হাতে গেলে দীর্ঘমেয়াদে পরিচয় চুরি, প্রতারণা ও লক্ষ্যভিত্তিক সাইবার আক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এখন তদন্তকারীদের প্রধান লক্ষ্য হলো হামলার পূর্ণ পরিধি নির্ধারণ করা এবং চুরি হওয়া তথ্য কোথায় গেছে তা শনাক্ত করা। পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের হামলা ঠেকাতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচয় যাচাই, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ, তথ্য পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত হামলা শনাক্ত করার ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

ফ্রান্সের কর প্রশাসনে এই হামলা তাই একটি বিচ্ছিন্ন সাইবার অপরাধের ঘটনা নয়। নাগরিকদের বিপুল পরিমাণ সংবেদনশীল তথ্য যখন সরকারি ডিজিটাল ব্যবস্থায় সংরক্ষিত, তখন সেই তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের জন্য বড় দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ভাষায়, ফ্রান্সে যা ঘটেছে তা স্বাভাবিক কোনো তথ্য ফাঁসের ঘটনা নয়; বরং সরকারি সাইবার নিরাপত্তার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। তদন্তের ফলই এখন নির্ধারণ করবে, এই হামলার প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ কতটা এবং ফরাসি প্রশাসন ভবিষ্যৎ সাইবার হামলা ঠেকাতে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে।