ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র ফ্রান্সে প্রতিবছর ঈদুল আজহা উপলক্ষে মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য বিশেষ কোরবানির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। দেশটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার অনুসারী হলেও ধর্মীয় স্বাধীনতা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। ফলে মুসলমানরা নির্দিষ্ট সরকারি বিধি ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে পশু কোরবানি করার সুযোগ পেয়ে থাকেন। তবে পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হয় প্রশাসনের কঠোর নজরদারির আওতায়।
ফ্রান্সে খোলা জায়গা, রাস্তা কিংবা বাসাবাড়িতে পশু জবাই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কেবল সরকার অনুমোদিত কসাইখানা বা অস্থায়ী অনুমোদিত জবাই কেন্দ্রে কোরবানি করা যায়। ঈদুল আজহার আগে দেশটির কৃষি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিভিন্ন অঞ্চলের প্রশাসনের মাধ্যমে অনুমোদিত জবাইখানার তালিকা প্রকাশ করে। স্থানীয় মসজিদ ও মুসলিম সংগঠনগুলোও মুসল্লিদের এসব তথ্য সরবরাহ করে থাকে।
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে কোরবানির অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করে ‘গ্রঁদ মস্কে দ্য প্যারিস’ বা প্যারিসের বড় মসজিদ।
ঐতিহাসিক এই মসজিদ কর্তৃপক্ষ ঈদের আগে মুসলমানদের জন্য নির্দেশিকা প্রকাশ করে এবং কোথায় বৈধভাবে কোরবানি করা যাবে সে বিষয়ে তথ্য দেয়। পাশাপাশি হালাল জবাইয়ের ধর্মীয় বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ হচ্ছে কিনা তাও তদারকি করা হয়।
অন্যদিকে লিওঁ শহরে ‘গ্রঁদ মস্কে দ্য লিওঁ’ বা ‘লিওঁ এর বড় মসজিদ’ মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। ঈদুল আজহার সময় রোন অঞ্চলের প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে তারা অনুমোদিত কসাইখানার ব্যবস্থা করে। একই সাথে ‘আরজিএমএল’ নামের হালাল সনদ প্রদানকারী সংস্থা ইসলামী বিধান অনুযায়ী পশু জবাই হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করে।
এ ছাড়া মার্সেই, তুলুজ, লিল এবং স্ত্রাসবুর্গসহ বিভিন্ন শহরে স্থানীয় মসজিদ ও ইসলামিক সংগঠনের তত্ত্বাবধানে কোরবানির আয়োজন করা হয়। অনেক এলাকায় ঈদের অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে অস্থায়ী জবাইখানা চালুর অনুমতিও দেয়া হয়। এসব স্থানে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশগত নিরাপত্তা কঠোরভাবে নিশ্চিত করা হয়।
ফরাসি আইন অনুযায়ী কোরবানির পশু অনুমোদিত খামার থেকে সংগ্রহ করতে হয় এবং পরিবহনের ক্ষেত্রেও বিশেষ নিয়ম মানা বাধ্যতামূলক। জবাইয়ের সময় প্রশিক্ষিত কর্মীর উপস্থিতি থাকতে হয়। আইন ভঙ্গ করে অবৈধভাবে পশু জবাই করলে বড় অঙ্কের জরিমানা এমনকি কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। প্রতি বছর ঈদুল আজহার সময় পুলিশ ও প্রশাসন বিশেষ নজরদারি চালায়, যাতে কোথাও নিয়ম বহির্ভূত কোরবানি না হয়।
ফ্রান্সে অনুমোদিত কসাইখানার বাইরে পশু জবাই ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। এ অপরাধে ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ১৫ হাজার ইউরো পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। প্রশাসন জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মান বজায় রাখতে এই আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করে।
ফ্রান্সে পশু কোরবানি নিয়ে প্রাণী অধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। তাদের দাবি, জবাইয়ের আগে পশুকে অজ্ঞান করা বাধ্যতামূলক করা উচিত, যাতে প্রাণীর কষ্ট কমে। অন্যদিকে মুসলিম সংগঠনগুলোর বক্তব্য, ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী কোরবানি করার অধিকার তাদের মৌলিক স্বাধীনতার অংশ। ফলে বিষয়টি প্রায়ই ধর্মীয় স্বাধীনতা ও প্রাণী কল্যাণের মধ্যকার ভারসাম্যের আলোচনায় পরিণত হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২০০৯ সালের আইন অনুযায়ী সাধারণভাবে জবাইয়ের আগে পশুকে অজ্ঞান করতে হয়। তবে ফ্রান্স ধর্মীয় ছাড়ের আওতায় হালাল ও কোশার জবাইয়ের ক্ষেত্রে এই বিধান শিথিল রেখেছে। ২০২০ সালের সরকারি নির্দেশনাও ধর্মীয় জবাই বন্ধ করেনি; বরং জবাই পদ্ধতি ও স্বাস্থ্যগত শর্ত আরও স্পষ্ট করেছে। পরবর্তীতে ২০২১ সালে ফরাসি কৃষি মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করে যে ধর্মীয় ছাড় বহাল রয়েছে।
আইনি অনুমতি থাকলেও বাস্তবে মুসলিম সম্প্রদায় প্রতি বছরই নানা সংকটে পড়ে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অনুমোদিত অস্থায়ী কসাইখানার ঘাটতি। উদাহরণ হিসেবে ২০২৫ সালে গার্দ বিভাগে পুরো মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য মাত্র একটি অস্থায়ী কসাইখানা অনুমোদন দেওয়া হয়, যা ভেস্ত্রিক-এ-কাঁদিয়াক এলাকায় পরিচালিত হয়েছিল বিভাগীয় জনসংখ্যা সুরক্ষা অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় ঈদের সময় ভেড়ার দামও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ফেব্রুয়ারিতে যে ভেড়ার দাম ছিল প্রায় ৯০ ইউরো, ঈদের সময় তা কয়েক গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। ফলে অনেক পরিবারের জন্য কোরবানি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে নিম শহরের ‘লুমিয়ের এ পিয়েতে’ মসজিদের মতো কিছু প্রতিষ্ঠান মুসল্লিদের সরাসরি পশু না কিনে বৈধ কসাইখানা থেকে মাংস সংগ্রহের পরামর্শ দিয়েছে। তাদের মতে, সীমিত অবকাঠামো, অতিরিক্ত দাম এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেক মুসলমানের পক্ষে প্রথাগতভাবে কোরবানি সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না।
সব বিতর্ক ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ফ্রান্সের মুসলিম সমাজে কোরবানি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশীলন হিসেবে টিকে আছে। অনেক পরিবার কোরবানির গোশত দরিদ্র ও অভাবী মানুষের মধ্যে বিতরণ করে থাকে। মসজিদ ও ইসলামিক সংগঠনগুলোও বিভিন্ন সামাজিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করে।
বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সে কোরবানির বর্তমান ব্যবস্থা ইউরোপীয় আইন, জনস্বাস্থ্য, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সামাজিক সহাবস্থানের একটি জটিল কিন্তু কার্যকর সমন্বয়ের উদাহরণ। বিতর্ক থাকলেও সরকার, প্রশাসন এবং মুসলিম সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে প্রতি বছর নিয়ন্ত্রিত উপায়ে কোরবানির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।



