ফ্রান্সে জীবনের শেষ পর্যায়ে ‘মৃত্যুসহায়তা’র অধিকার চালুর আইন কার্যকর হওয়ার পর তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন মেজোঁ দ্য ল’ইউরোপের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্রিটানির সাবেক ইউডিএফ আঞ্চলিক কাউন্সিলর জ্যাঁ-ফ্রাঁসোয়াজ হুতিন। আইনটি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ অনুমোদন করার পর তিনি নিজের পাওয়া ফ্রান্সের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘লেজিয়ন দ’অনার’ প্রেসিডেন্টের হাতে সরাসরি ফিরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। এ উদ্দেশ্যে এলিসি প্রাসাদে ম্যাক্রোঁর সাথে সাক্ষাতের জন্য আবেদনও করেছেন তিনি।
হুতিনের এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শেষে ফ্রান্সে মৃত্যুসহায়তা সংক্রান্ত আইনটি চূড়ান্ত হয়েছে। ফরাসি পার্লামেন্ট ২০২৬ সালের ১৫ জুলাই আইনটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করে। জাতীয় পরিষদে অনুষ্ঠিত চূড়ান্ত ভোটে ২৯১ জন আইনপ্রণেতা প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন, ২৪১ জন বিপক্ষে এবং ২৯ জন বিরত থাকেন। পরে আইনটি সাংবিধানিক পরিষদের পরীক্ষার মুখোমুখি হয় এবং ১৪ আগস্ট পরিষদ আইনটিকে সংবিধানসম্মত বলে ঘোষণা করে। এরপর ১৮ আগস্ট প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ আইনটিতে স্বাক্ষর করেন এবং ১৯ আগস্ট তা সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়।
নতুন আইনে নির্দিষ্ট কিছু কঠোর শর্ত পূরণকারী প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির জন্য ‘মৃত্যুসহায়তা’র অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। এর আওতায় গুরুতর ও নিরাময়-অযোগ্য রোগে আক্রান্ত এবং জীবন প্রত্যাশা গুরুতরভাবে সংকুচিত এমন ব্যক্তি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রাণঘাতী একটি পদার্থ ব্যবহারের অনুমতি চাইতে পারবেন। ব্যক্তি শারীরিকভাবে সক্ষম হলে নিজেই তা গ্রহণ করতে পারবেন; আর তা সম্ভব না হলে নির্ধারিত শর্তে একজন চিকিৎসক বা নার্স সেই পদার্থ প্রয়োগ করতে পারবেন। আইনে চিকিৎসাকর্মীদের জন্য বিবেকগত আপত্তির কসুযোগও রাখা হয়েছে।
এই আইনকে কেন্দ্র করেই দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি জানিয়ে আসছেন হুতিন। ২০২১ সাল থেকেই তিনি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁকে জানিয়ে আসছেন যে, জীবনের শেষ পর্যায়ে মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করার সুযোগ আইনগতভাবে স্বীকৃতি পেলে তিনি তার লেজিয়ন দ’অনার ফিরিয়ে দেবেন। ২০২৪ সালেও তিনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, মৃত্যুসহায়তা ও ইউথানেশিয়ার পথ খুলে দেয়া হলে তিনি এই রাষ্ট্রীয় সম্মাননা আর নিজের কাছে রাখতে চান না।
শুক্রবার প্রকাশিত তার খোলা চিঠিতে হুতিন জানান, আইনটির অনুমোদন তাকে ‘বিস্মিত’ করেছে। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্টের হাতে নিজের লেজিয়ন দ’অনার সরাসরি ফিরিয়ে দিতে চান এবং সেই কারণেই ম্যাক্রোঁর সাথে ব্যক্তিগত সাক্ষাতের অনুরোধ জানিয়েছেন। তার কাছে এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত প্রতিবাদের বিষয় নয়; বরং জীবনের মূল্য, চিকিৎসার নৈতিকতা এবং সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি মৌলিক অবস্থান।
চিঠিতে হুতিন তার আপত্তির নৈতিক ও ধর্মীয় ভিত্তিও তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন আইনটি বাইবেলের ‘তুমি হত্যা করবে না’ নীতির সাথে সরাসরি সংঘাত তৈরি করে। একই সাথে তিনি হিপোক্রেটিক শপথের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, যা তার ভাষায় প্রায় ২৫ শতাব্দী ধরে চিকিৎসা পেশার নৈতিক ভিত্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তার আশঙ্কা, চিকিৎসাব্যবস্থার উদ্দেশ্য যদি জীবন রক্ষা ও কষ্ট লাঘবের পাশাপাশি মৃত্যুর পথ তৈরি করাও হয়ে যায়, তাহলে চিকিৎসকের ভূমিকা এবং সমাজের নৈতিক কাঠামো নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন তৈরি হবে।
হুতিন আরো দাবি করেন, নতুন আইনের পেছনে থাকা কিছু ধারণা বাস্তবতার সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষ করে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, একজন মানুষের মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষাকে সব সময় স্বাধীন, স্থির ও যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যায় কি না। তার মতে, মৃত্যুর আবেদন অনেক সময় দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, মানসিক ক্লান্তি, নিজেকে পরিবারের জন্য বোঝা মনে করা, কিংবা নিজের জীবনের মূল্য হারিয়ে ফেলার অনুভূতি থেকে তৈরি হতে পারে।
এই জায়গাতেই তার মূল আপত্তি। হুতিনের আশঙ্কা, একজন গুরুতর অসুস্থ বা বয়স্ক মানুষ যখন নিজেকে পরিবারের ওপর বোঝা বলে মনে করবেন, তখন তার মৃত্যুর ইচ্ছাকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা কতটা নিরাপদ—সেটি সমাজকে গভীরভাবে ভাবতে হবে। তিনি এমন এক বয়স্ক ব্যক্তির কথাও উল্লেখ করেছেন, যিনি তাকে নিজের আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন। ওই ব্যক্তি ভয় প্রকাশ করেছিলেন, ভবিষ্যতে যদি তাকে মৃত্যুর এই পথ বেছে নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়, তখন তিনি কীভাবে সেই প্রস্তাবের জবাব দেবেন।
হুতিনের মতে, এই আশঙ্কা কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়। এর সাথে সামাজিক চাপ, একাকীত্ব, বার্ধক্য, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা এবং পরিবারের ওপর নির্ভরশীলতার মতো বিষয়ও জড়িত। ফলে মৃত্যুসহায়তার ক্ষেত্রে কেবল একজন ব্যক্তির ঘোষিত ইচ্ছাই যথেষ্ট কি না, নাকি তার মানসিক ও সামাজিক পরিস্থিতিকেও আরো গভীরভাবে বিবেচনা করা দরকার—এই প্রশ্ন তিনি সামনে আনতে চান।
তবে আইনটির সব দিক নিয়ে তার অবস্থান একেবারে নেতিবাচক নয়। সাংবিধানিক পরিষদ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও ফার্মাসিস্টদের বিবেকের স্বাধীনতার বিষয়টি স্বীকৃতি দেয়ায় তিনি স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। নতুন আইনে অংশগ্রহণে অস্বীকৃতির জন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের বিবেকগত আপত্তির সুযোগ রাখা হয়েছে। সাংবিধানিক পর্যালোচনার সময় এই বিষয়টিও আলোচনার মধ্যে ছিল।
হুতিনের মতে, মৃত্যুসহায়তার সুযোগ দেওয়ার আগে রাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত প্রত্যেক মানুষের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা, প্যালিয়েটিভ কেয়ার বা উপশমমূলক চিকিৎসা এবং যন্ত্রণামুক্তভাবে জীবনের শেষ সময় কাটানোর সুযোগ নিশ্চিত করা। ফ্রান্সে এ বিষয়ে পৃথক আইনও ইতোমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে, যার লক্ষ্য সবার জন্য প্যালিয়েটিভ কেয়ার ও জীবনের শেষ পর্যায়ের সহায়তায় সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।
ফ্রান্সের নতুন মৃত্যুসহায়তা আইনটি আসলে বহু বছরের রাজনৈতিক বিতর্কের ফল। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ ২০২২ সালের নির্বাচনী প্রচারে জীবনের শেষ পর্যায়ের অধিকার নিয়ে নতুন আইন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পরে নাগরিক সম্মেলন ও দীর্ঘ সংসদীয় আলোচনার মধ্য দিয়ে বিষয়টি এগোয়। ২০২৫ সালে জাতীয় পরিষদ ও সিনেটে আলোচনা শুরু হওয়ার পর দুই কক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়। ২০২৬ সালে একাধিক দফায় আইনটি নিয়ে পুনরায় আলোচনা হয় এবং শেষ পর্যন্ত ১৫ জুলাই জাতীয় পরিষদ চূড়ান্তভাবে আইনটি অনুমোদন করে।
আইনটির সমর্থকদের যুক্তি, অসহনীয় ও নিরাময়-অযোগ্য যন্ত্রণায় আক্রান্ত একজন মানুষকে নিজের জীবনের শেষ মুহূর্ত সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ দেয়া ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রশ্ন। অন্যদিকে বিরোধীদের আশঙ্কা, মৃত্যুকে চিকিৎসা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিলে দুর্বল, বয়স্ক, অসুস্থ বা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন মানুষ পরোক্ষ চাপের মুখে পড়তে পারেন। হুতিনের অবস্থান মূলত এই দ্বিতীয় উদ্বেগের সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
নিজের লেজিয়ন দ’অনার ফেরত দেয়ার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে হুতিন তাই কেবল প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর একটি নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করছেন না; তিনি ফ্রান্সের চিকিৎসা-নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কও সামনে আনতে চাইছেন। তার আশঙ্কা, ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপ্রধানের নাম যদি ইউথানেশিয়ার সাথে যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে সেটি তার কাছে গভীরভাবে বেদনাদায়ক হবে।
খোলা চিঠির শেষাংশে হুতিন জানান, তার এই উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি শুধু নিজের ব্যক্তিগত মত প্রকাশ করতে চান না। তার দাবি, ফ্রান্সের বহু মানুষ নতুন আইন নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং তাদের অনুভূতিও রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন। প্রেসিডেন্টের হাতে লেজিয়ন দ’অনার ফিরিয়ে দেয়ার ইচ্ছা তাই তার কাছে একটি প্রতীকী রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রতিবাদ—যার মাধ্যমে তিনি বলতে চান, জীবনের শেষ পর্যায়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত তার কষ্ট লাঘব করা, মৃত্যুকে সহজ করে দেয়া নয়।



