বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) অভিনব কায়দায় দু’টি আবাসিক হলে চুরির ঘটনা ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিকন্যা হলে সিলিং ভেঙে এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলে গ্রিল কেটে চোর নগদ অর্থ, মোবাইল ফোন ও মূল্যবান জিনিস চুরি করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
জানা গেছে, শুক্রবার (১৫ মে) রাতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের ডি ব্লকের চারতলার ৪৪১ ও ৪৪০ নম্বর কক্ষেও চুরির ঘটনা ঘটে। চোর জানালার দু’টি স্টিলের শিক কেটে কক্ষে প্রবেশ করে। এ সময় মূল্যবান মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ ও নগদ টাকা নিয়ে যান। এই ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগে কৃষিকন্যা হলের খ ব্লকের ১৩ নম্বর কক্ষে সিলিং ভেঙে চুরির ঘটনা ঘটে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, চোর সিলিংয়ের পথ দিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে নগদ প্রায় চার হাজার টাকা, আইডি কার্ডসহ দু’টি ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায়।
ভুক্তভোগী কৃষিকন্যা হলের একজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘রাত ৭টা ৪৫ মিনিটের দিকে আমি রিডিং রুম থেকে ফিরেছিলাম। দরজায় তালা খুলতে গিয়ে দেখি ভেতর থেকে দরজার ছিটকিনি আটকানো। অথচ রুমে তখন আমাদের কোনো রুমমেট ছিল না। তখন জানালা দিয়ে চোরকে দেখতে পাই। আমাকে দেখা মাত্র চোরটি সিলিংয়ের পথ দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যান। আমার চিৎকার শুনে তখন আশপাশের সবাই ছুটে আসেন। পরে আমরা রুমে ঢুকে দেখি, আমাদের প্রায় চার হাজার টাকা আর আইডি কার্ডসহ দু’টি ব্যাগ নিয়ে চোর পালিয়ে গেছেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘পুরো ঘটনায় আমরা এখনো আতঙ্কে আছি। আমাদের প্রশ্ন হলো, হলের বাউন্ডারি পেরিয়ে মেয়েদের হলে একটি তালাবদ্ধ রুমেও যদি এভাবে সিলিং ভেঙে চোর ঢুকে পড়ে, তবে আমাদের নিরাপত্তা কোথায়? হলের ভেতর আমাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বলতে তো আর কিছুই থাকল না। প্রশাসনের কাছে আমার একটাই দাবি একজন মেয়ে হয়ে হলের ভেতর আমরা কিভাবে নিরাপদ থাকব, সেটা আগে নিশ্চিত করা হোক।’
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাকৃবিতে বিভিন্ন সময় হল, অনুষদীয় করিডোর থেকে সাইকেল চুরি নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আজ চোর চারতলার মতো জায়গায় উঠে জানালার গ্রিল কেটে চুরি করেছে।
এ সময় হলের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও এর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শিক্ষার্থীরা। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে উচ্চ রেজুলেশনের সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, নিরাপত্তা কর্মীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত এবং হল এলাকায় নিয়মিত নজরদারি বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
কৃষিকন্যা হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বলেন, ‘হলের নির্মাণ কাজ চলমান। সেখানে প্রয়োজনের তুলনায় কর্মী সংখ্যা অনেক কম। আমি আমার জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু আজকের এ ঘটনাটি সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত। এটি পরিকল্পিত কোনো ঘটনা হতে পারে অথবা কোনো নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি সুযোগ বুঝে এই কাজ করেছে বলে অনুমান করছি।’
অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দী হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো: বজলুর রহমান মোল্লা বলেন, ‘সোহরাওয়ার্দী হলের আজকের চুরির ঘটনাটি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তৎপর রয়েছে। উক্ত ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং প্রক্রিয়া উদঘাটনের লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, শিক্ষার্থীরা রুমে থাকা অবস্থাতেই জানালা কেটে এই চুরির ঘটনা ঘটেছে, যা কিছুটা অস্বাভাবিক এবং বর্তমানে তদন্তাধীন পর্যায়ে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মীদের কোনো প্রকার অবহেলা ছিল কি-না, তাও গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া মাত্রই বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিরাপত্তা শাখাকে অবহিত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
বাকৃবির নিরাপত্তা কাউন্সিলের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো: আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা বা স্বাধীন রক্ষী থাকলেও, সার্বিক নজরদারির স্বার্থে সেন্ট্রাল সিকিউরিটি সেকশন থেকে আমরা সর্বদা তৎপর আছি। কৃষিকন্যা হলের চুরির ঘটনার পরপরই চিফ সিকিউরিটি অফিসারকে পাঠিয়ে একটি সম্ভাব্য প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে এবং কারণসমূহ চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তবে বিশাল এই ক্যাম্পাসে জনবল সঙ্কট একটি বড় সমস্যা, যার সুযোগ নিয়ে চোরেরা অন্ধকার ও আড়ালে থাকা সীমানাগুলোকে টার্গেট করে।’
এ বিষয়ে বাকৃবির ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর ড. কাজী ফরহাদ কাদির বলেন, ‘আমরা হলগুলোর প্রভোস্টদের সাথে কথা বলেছি। হলের নিরাপত্তার দায়িত্ব মূলত প্রভোস্টের। হলের ভেতরের নিরাপত্তার বিষয়টাতেও ঘাটতি আছে, যেটা প্রভোস্টের এখতিয়ারে পড়ে। সেখানে সিসি ক্যামেরারও বোধহয় কভারেজ নেই। তো সেই দিকগুলোতে আসলে আমাদের একটু জোরদার করতে হবে। আমাদের অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী হলের শান্তিশৃঙ্খলার দায়িত্বে প্রক্টোরিয়াল বডি আছে, নিরাপত্তার জন্য নিরাপত্তা সেকশন আছে, ফ্যাকাল্টিগুলোতে ডিন মহোদয় এবং হলগুলোতে প্রভোস্টের দায়িত্ব আছে। সমন্বয়ের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সবাইকে কাজ করা দরকার।’



