বাকৃবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ফেল করানোর অভিযোগ

আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের ফলাফলে বিরূপ প্রভাব পড়ার অভিযোগ উঠেছে। ভিসি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী অ্যাকাডেমিক নিয়ম মেনে ফলাফল পুনরায় পর্যালোচনার বিষয়টি দেখা হবে।

মো: লিখন ইসলাম, বাকৃবি
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো |নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) বিএসসি ইন ভেটেরিনারি সায়েন্স অ্যান্ড অ্যানিমেল হাজবেন্ড্রি (কম্বাইন্ড ডিগ্রি) চালুর দাবিতে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক ফলাফলে বিরূপ প্রভাব পড়ার অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক ফলাফলে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া শিক্ষার্থীদের হাজবেন্ড্রি অনুষদের একাধিক কোর্সে অস্বাভাবিকভাবে ফেল করানোকে কেন্দ্র করে এ অভিযোগ সামনে এসেছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ততার কারণে তারা মূল্যায়নে পক্ষপাতের শিকার হয়েছেন।

২০২৫ সালে কম্বাইন্ড ডিগ্রি চালুর দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া অ্যানিম্যাল হাজবেন্ড্রি অনুষদের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী এ এন এম এহসানুল হক হিমেলের ফলাফলকে ঘিরে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। লেভেল-৩, সেমিস্টার-২-এর ফল প্রকাশের পর অ্যানিমেল সায়েন্স বিভাগের মিট সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি কোর্সের থিওরি ও প্র্যাকটিক্যাল দুই কোর্সেই তিনি অকৃতকার্য হয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে হিমেল তার আগের সেমিস্টারের ফলাফল ও নম্বরপত্র প্রকাশ করে সাম্প্রতিক ফলাফলের সাথে তুলনা করেন। তার দাবি, আন্দোলনের আগে তার অ্যাকাডেমিক ফলাফল সন্তোষজনক ছিল। লেভেল-২, সেমিস্টার-২ শেষে তার গড় সিজিপিএ ছিল ৩.৬৭১ ও তখন পর্যন্ত কোনো কোর্সে ক্যারি (ফেল) ছিল না। তবে আন্দোলনের পর লেভেল-৩, সেমিস্টার-১-এ তার সিজিপিএ কমে ২.৯৪৬ হয়। পরের সেমিস্টারে সিজিপিএ ৩.২৭৮ হলেও মিট সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি কোর্সের থিওরি ও প্র্যাকটিক্যাল উভয় কোর্সেই এফ গ্রেড এসেছে।

হিমেল বলেন, ‘উক্ত কোর্সের ক্লাস টেস্ট, এটেন্ডেন্স ও নোটবুকে আমার পারফরম্যান্স সন্তোষজনক ছিল। এরপরও থিওরি ও প্র্যাকটিক্যাল উভয় অংশে ফেল আসা অপ্রত্যাশিত। আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণে কোনো শিক্ষার্থীর অ্যাকাডেমিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত করা কোনো শিক্ষকের কাছেই কাম্য নয়। ধারাবাহিকভাবে ফলাফল বিপর্যয়ের কারণে আমি ও আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট সহপাঠীরা উদ্বেগ ও হতাশার মধ্যে রয়েছি।’

ভেটেরিনারি সায়েন্স অনুষদের ডক্টর অব ভেটেরিনারি (ডিভিএম) ডিগ্রির বিভিন্ন ব্যাচের কয়েকটি কোর্সের ফল নিয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যেও অসন্তোষ রয়েছে। এর মধ্যে লেভেল-২, সেমিস্টার-১-এর এলিমেন্টারি ডেইরি সায়েন্স ও লেভেল-৩, সেমিস্টার-১-এর অ্যানিমেল ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট কোর্স রয়েছে। কোর্স দু’টি অ্যানিমেল হাজবেন্ড্রি অনুষদের ডেইরি সায়েন্স ও অ্যানিমেল সায়েন্স বিভাগের সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা পড়ান। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, একই সেমিস্টারের অন্য কোর্সের তুলনায় এসব কোর্সে তাদের ফল অস্বাভাবিকভাবে কম হয়েছে।

ভেটেরিনারি সায়েন্স অনুষদের ডিন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এলিমেন্টারি ডেইরি সায়েন্স ও অ্যানিমেল ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট দু’টি কোর্সেই সর্বোচ্চ গ্রেড এ প্লাস পেয়েছেন মাত্র তিনজন করে শিক্ষার্থী। একই সেমিস্টারের অন্য কোর্সে তুলনামূলক ভালো ফল করলেও এসব কোর্সে প্রত্যাশার তুলনায় কম ফল হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

লেভেল-১-এর শিক্ষার্থীদের মধ্যেও পশুপালন অনুষদের সংশ্লিষ্ট কয়েকটি কোর্সের ফল নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের অভিযোগ, একই সেমিস্টারের অন্য কোর্সে ভালো ফল করলেও এসব কোর্সে তুলনামূলক কম নম্বর পেয়েছেন তারা।

ফলাফল পুনঃবিবের্চনার দাবিতে লেভেল-৩, সেমিস্টার-২-এর শিক্ষার্থীরা লেভেল-৩, সেমিস্টার-১-এর ফলাফল নিয়ে ও লেভেল-২, সেমিস্টার-২-এর শিক্ষার্থীরা লেভেল-২, সেমিস্টার-১-এর ফলাফল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বরাবর আবেদন করেন। ভেটেরিনারি সায়েন্স অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো: বাহানুর রহমানের মাধ্যমে গত ২৬ জানুয়ারি পৃথকভাবে আবেদনগুলো জমা দেয়া হয়।

তবে আবেদনের ছয় মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত বা ফলাফল জানানো হয়নি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভেটেরিনারি সায়েন্স অনুষদের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘কম্বাইন্ড ডিগ্রি চালুর আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ভেটেরিনারি ও পশুপালন অনুষদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব এখনো বিভিন্ন ক্ষেত্রে রয়েছে। সেই বিরোধের নেতিবাচক প্রভাব অ্যাকাডেমিক মূল্যায়নে পড়ছে ও এর ভুক্তভোগী হচ্ছি আমরা শিক্ষার্থীরা।’

পশুপালন অনুষদের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী শিবলী সাদী জানান, গত ১৮ আগস্ট অ্যানিমেল হাজব্যান্ড্রি অনুষদের লেভেল-৩, সেমিস্টার-২-এর ফল প্রকাশিত হয়েছে। তার দাবি, কম্বাইন্ড ডিগ্রির দাবিতে আন্দোলনে সম্মুখসারিতে থেকে নেতৃত্ব দেয়া শিক্ষার্থীদের ফলাফলে ধারাবাহিকভাবে অবনতি দেখা গেছে। বিশেষ করে মিট সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি কোর্সে আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী শিক্ষার্থীদের কারও থিওরি, কারও প্র্যাকটিক্যাল ও কারও উভয় অংশে ফেল এসেছে।

শিবলী জানান, গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত সমঝোতা সভায় ভিসি জানিয়েছিলেন, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কোনো ধরনের প্রশাসনিক বা অ্যাকাডেমিক শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে না। কিন্তু পরে তারা এর ব্যত্যয় লক্ষ্য করছেন। বিষয়টির সুষ্ঠু সমাধানের দাবি জানান তিনি।

এ বিষয়ে অ্যানিমেল হাজবেন্ড্রি অনুষদের ডিন ড. মো: রকিবুল ইসলাম খান বলেন, ‘পেশাগত দায়িত্বকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। শিক্ষার্থীদের সাথে কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ বা আন্দোলনের প্রভাব অ্যাকাডেমিক ফলাফলে পড়া উচিত নয়। ছাত্ররা যেটি আশঙ্কা করছে, সেটি ঘটেছে বলে আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। এরকম ঘটে থাকলে সেটি খুবই দুঃখজনক।’

তিনি আরো বলেন, ‘একজন শিক্ষকের ভূমিকা একজন বিচারকের চেয়েও বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন সবার জন্য সমান। কোনো শিক্ষার্থীর অধিকার যেন ক্ষুণ্ণ না হয়, সেদিকে আমরা সজাগ দৃষ্টি রাখছি। যেকোনো গোপনীয় বা নেতিবাচক বিষয় নিশ্চিত না হয়ে সরাসরি ফেসবুক বা জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত নয়। এতে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে। শিক্ষার্থীরা চাইলে ফলাফল পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করতে পারেন। অনুষদের ডিন হিসেবে আমি তাদের সহযোগিতায় আছি।’

ভেটেরিনারি সায়েন্স অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো: বাহানুর রহমান বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা তাদের ফলাফল নিয়ে অসন্তোষের বিষয়টি আমাকে জানিয়েছিল। এরপর তারা অনুষদের ডিনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বরাবর লিখিত আবেদন করেন। আমি আবেদনগুলো একসাথে সংগ্রহ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জমা দিয়েছি। তবে এখন পর্যন্ত এসব আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো সিদ্ধান্ত বা ফলাফল সম্পর্কে জানতে পারিনি।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মো: শহীদুল হক বলেন, ‘পরীক্ষার ফলাফল পুনর্বিবেচনার বিষয়ে এক্সাম কন্ট্রোলারের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। তিনি বলতে পারবেন ভেটেরিনারি অনুষদের শিক্ষার্থীদের আগের আবেদনটি পৌঁছেছে কিনা বা কেন সেটি অ্যাডজাস্ট করা হয়নি।’

অভিযোগকারী শিক্ষার্থীকে বিষয়টি বিস্তারিত উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে আবেদন করার পরামর্শ দিয়েছেন ভিসি অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ‘তদন্ত কমিটির মাধ্যমে যাতে বিষয়টি খতিয়ে দেখা যায়, এ জন্য বিস্তারিত বিবরণসহ আবেদন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী অ্যাকাডেমিক নিয়ম মেনে ফলাফল পুনরায় পর্যালোচনার বিষয়টি দেখা হবে।’