গোবিপ্রবি প্রতিনিধি
গবেষণাপত্রে তথ্য ও ফলাফলের অসঙ্গতি, ভুয়া বা প্রভাবিত পিয়ার রিভিউ, অবিশ্বস্ত ফলাফল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বা কম্পিউটার সৃষ্ট কনটেন্টের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, সাইটেশন কারসাজি এবং তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) মোট ছয়টি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নাল থেকে প্রত্যাহার (রিট্র্যাক্ট) করা হয়েছে। প্রত্যাহার হওয়া গবেষণাপত্রগুলোর মধ্যে এক শিক্ষকের নাম দু’টি এবং চারজন সাবেক শিক্ষার্থীর নাম পৃথক চারটি গবেষণাপত্রে রয়েছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিকভাবে গবেষণাপত্র প্রত্যাহার ও সংশ্লিষ্ট সম্পাদকীয় নোটিশ সংরক্ষণকারী রিট্রেকশন ওয়াচের ডাটাবেজ বিশ্লেষণে এ তথ্য জানা গেছে।
ডাটাবেজ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১১ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ২০ জুন পর্যন্ত সময়ে গোবিপ্রবি সংশ্লিষ্ট ছয়টি গবেষণাপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়। গবেষণাপত্রগুলো ২০২২ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল। প্রকাশের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বশেমুরবিপ্রবি)। পরে ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (গোবিপ্রবি) করা হয়।
প্রত্যাহার হওয়া গবেষণাপত্রগুলোর মধ্যে গণিত বিভাগের দু’টি, বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের দু’টি, বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দু’টি (এর মধ্যে একটি বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের সাথে যৌথ) এবং ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একটি গবেষণাপত্র রয়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ছয়টি গবেষণাপত্রের মধ্যে পাঁচটিতে তথ্য ও ফলাফলের অসঙ্গতি এবং অবিশ্বস্ততা প্রত্যাহারের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া তিনটি গবেষণাপত্রে ভুয়া বা প্রভাবিত পিয়ার রিভিউ এবং এআই বা কম্পিউটার সৃষ্ট কনটেন্টের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। দু’টি গবেষণাপত্রে সন্দেহজনক প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় এবং তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের বিষয়ও প্রকাশকদের নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রদত্যাহার হওয়া গবেষণাপত্রগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ দু’টি গবেষণাপত্রে নাম রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফারিয়া আহমেদ শামির। নোশন অব করপ্লেক্স স্ফেরিকা ফুজি গ্রাফ উইথ অ্যাপলিকেশন ও দ্য রিফরমুলেটেড এফ-ইনডেক্স অব ভারটিক্স অ্যান্ড এইজড এফ-জয়েন অব গ্রাফিক্স শীর্ষক গবেষণাপত্র দু’টি তথ্য ও ফলাফলের অসঙ্গতি, অবিশ্বস্ততা, ভুয়া বা প্রভাবিত পিয়ার রিভিউ, এআই-সৃষ্ট কনটেন্টের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, অপ্রাসঙ্গিক তথ্যসূত্র ব্যবহার এবং তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের অভিযোগে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এছাড়া বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী তানজিম ইশরাক রহমানের কভিড-১৯ এন বাংলাদেশ: ওয়েভ-সেনট্রিক এসেসমেন্ট অ্যান্ড মিটিগেশন মেজারস ফর ফিউচার পেনডামিক্স ও অ্যাডভান্স ইমপ্লিকেশস অব ন্যানোটেকনোলজি হস ডিজিজ কনট্রোল অ্যান্ড ইনভাইরোমেন্টাল প্রাসপেক্টটিভস শীর্ষক দু’টি গবেষণাপত্র সন্দেহজনক প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়, তথ্য ও ফলাফলের অসঙ্গতি এবং অবিশ্বস্ততার অভিযোগে প্রত্যাহার করা হয়েছে। দ্বিতীয় গবেষণাপত্রটিতে বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী দীপ্ত দে-এরও নাম রয়েছে। তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত।
অন্যদিকে মাল্টিফেসড রোল অব ন্যাচেরাল সোর্সেস ফর কভিড-১৯ পেনডামিক এজ মেরিন ড্রাগস শীর্ষক গবেষণাপত্রটি তথ্য ও ফলাফলের অসঙ্গতি, অবিশ্বস্ততা এবং এআই বা কম্পিউটার সৃষ্ট কনটেন্টের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের অভিযোগে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এতে বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী শেখ সোহাগের নাম রয়েছে। তিনি বর্তমানে জাপানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত।
এ ছাড়া দ্য এক্সপেরিমেন্টাল সিগনিফিকেন্স অব ইসোরহামনেটিন এজ এন ইফেকটিভ থেরাপিউটিক অপশন ফর ক্যান্সার: এ কমপ্রিহেনসিভ অ্যানালাইসিস শীর্ষক গবেষণাপত্রটি সন্দেহজনক প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়, তথ্য ও ফলাফলের অসঙ্গতি এবং অবিশ্বস্ততার অভিযোগে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এতে ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মো: হাসিবুল হাসানের নাম রয়েছে। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো: শামসুল আরেফিন বলেন, ‘গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। একটি গবেষণাপত্র বিভিন্ন কারণে প্রত্যাহার হতে পারে। তাই যথাযথ তদন্ত ছাড়া কোনো মন্তব্য বা সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়। তদন্ত শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. নাজমুস সাদাত বলেন, ‘এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি বিষয়। বিষয়টি জানার পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের কারণ জানা হবে। তদন্তে কোনো ধরনের অসদাচরণের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’



