ওসমান হাদির ৪৪ বক্তব্য নিয়ে ডাকসুর ‘বারুদমাখা কথামালা’ প্রকাশ

শরীফ ওসমান হাদির বিভিন্ন সময়ে দেয়া ৪৪টি বক্তব্য নিয়ে সংকলনটি প্রকাশ করা হয়েছে। ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ গ্রন্থটি সম্পাদনা ও প্রকাশ করেছেন। হাদির বক্তব্য ও চিন্তাধারা সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রয়াস হিসেবে সংকলনটি প্রকাশ করা হয়েছে বলে আয়োজকরা জানান।

নয়া দিগন্ত অনলাইন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) প্রকাশিত শহীদ শরীফ ওসমান হাদির বক্তব্য সংকলন ‘বারুদমাখা কথামালা’র মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে জুলাই শহীদ স্মৃতি ভবন অডিটোরিয়ামে এ উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

শরীফ ওসমান হাদির বিভিন্ন সময়ে দেয়া ৪৪টি বক্তব্য নিয়ে সংকলনটি প্রকাশ করা হয়েছে। ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ গ্রন্থটি সম্পাদনা ও প্রকাশ করেছেন। হাদির বক্তব্য ও চিন্তাধারা সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রয়াস হিসেবে সংকলনটি প্রকাশ করা হয়েছে বলে আয়োজকরা জানান।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন দৈনিক আমার দেশ-এর সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান। অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ও সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ডেইলি ওয়াদাহ-এর সম্পাদক ও সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী, সংসদ সদস্য ডা. মাহমুদা মিতু ও ডা. মারদিয়া মমতাজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক জহিরুল ইসলাম, ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল জাবের, সদস্য সচিব ও ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা এবং ডাকসুর ক্রীড়া সম্পাদক আরমান হোসেনসহ অনেকে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম। সঞ্চালনা করেন ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য আফসানা আক্তার। এ ছাড়া ডাকসু ও বিভিন্ন হল সংসদের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড, গুম-নির্যাতন ও জুলাই গণহত্যার ঘটনায় অভিযুক্তদের অনেকে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, পৃথিবীতে এত দেশ থাকতে অভিযুক্তরা কেন বারবার ভারতে আশ্রয় নিচ্ছেন।

DU-25-8===

শরীফ ওসমান হাদির চিন্তার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, হাদি বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব পরিচয় ও সাংস্কৃতিক সত্তা প্রতিষ্ঠার কথা বলতেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব আরো সংহত করতে নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় শক্তিশালী করার বিকল্প নেই। এ কারণেই হাদি ‘কালচারাল রেভল্যুশন’ বা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কথা বলতেন।

ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করে মাহমুদুর রহমান বলেন, তিনি ও ওসমান হাদি একসাথে হাদির মায়ের লাশ কবরে রেখেছিলেন। পরে তাকেই হাদির লাশ কবরে রাখতে হয়েছে। জুলাই আন্দোলনের শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠার কারণেই হাদি হত্যার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, ওসমান হাদি প্রায়ই বলতেন, সংসদে যেতে পারলে তিনি বাকি ২৯৯ সংসদ সদস্যের ঘুম হারাম করে দেবেন। অথচ আজ সংসদে দাঁড়িয়েও তার হত্যার বিচার পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।

শফিকুল আলম বলেন, ওসমান হাদি বাংলাদেশের স্বাধীনতা বা ‘আজাদির’ প্রশ্নটি যেভাবে উপস্থাপন করতেন, তা ছিল ব্যতিক্রমী। হাদি বিশ্বাস করতেন, জুলাই আন্দোলন এখনো শেষ হয়নি এবং মানুষের লড়াই মূলত একটি সাংস্কৃতিক লড়াই। প্রকৃত মুক্তির জন্য সাংস্কৃতিক সচেতনতা প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করতেন।

এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, হাদি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সাথে যোগাযোগ করে নানা পরামর্শ দিতেন। রাজনৈতিক দলগুলো অনেক সময় তার চিন্তা ও পরামর্শকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। তিনি যে বাংলাদেশপন্থী রাজনীতির রূপরেখা রেখে গেছেন, তার মৃত্যুর পর তা আরো বেশি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।

সংসদ সদস্য ডা. মারদিয়া মমতাজ বলেন, ওসমান হাদি তাদের ওপর অনেক দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। তার বক্তব্য ও চিন্তাভাবনার সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তার চিন্তা থেকে প্রয়োজনীয় বিষয় বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

সংসদ সদস্য ডা. মাহমুদা মিতু বলেন, ভারতের সাথে ন্যায্য পানি বণ্টন, ওসমান হাদির হত্যাকারীদের দেশে ফিরিয়ে আনা এবং জুলাই গণহত্যার সাথে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে।

ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, বিভিন্ন পডকাস্ট, সাক্ষাৎকার ও অন্যান্য মাধ্যমে ওসমান হাদি যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, সেগুলো একটি শক্তিশালী চিন্তাধারার প্রতিনিধিত্ব করে। সমাজ, রাষ্ট্র ও জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে হাদি কীভাবে চিন্তা করতেন, তার প্রতিফলন রয়েছে এসব বক্তব্যে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বক্তব্যগুলো একত্রিত করেই ডাকসু সংকলনটি প্রকাশ করেছে।

ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বলেন, ওসমান হাদি সাংস্কৃতিক বিপ্লবে বিশ্বাস করতেন। তার ধারণা ছিল, এ অঞ্চলে যত রাজনৈতিক বিপ্লবই হোক, সাংস্কৃতিক বিপ্লব ছাড়া মানুষের ভাগ্যের প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়।

সভাপতির বক্তব্যে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, শহীদ ওসমান হাদির বক্তব্যগুলো প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মানুষের কাছে ছড়িয়ে দিতে হবে। তিনি বলেন, হাদি যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কাজের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে।

ক্যাম্পাসে গেস্টরুম-গণরুম সংস্কৃতি ও শিক্ষার্থীদের ওপর নিপীড়ন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হলে তা প্রতিহত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ওসমান হাদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের শিক্ষা দিয়ে গেছেন।

সাদিক কায়েম জানান, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ব্রেইল পদ্ধতিতে বই প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষায়ও বই প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, কিছু মানুষ পৃথিবীতে না থাকলেও তাদের চিন্তাধারা ও আদর্শ মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকে। শহীদ শরীফ ওসমান হাদি তেমনই একজন। তিনি মানুষের অব্যক্ত কথাগুলো কীভাবে উচ্চারণ করতে হয়, তা শিখিয়ে গেছেন।

ওসমান হাদির স্মৃতি ও চিন্তাধারা সংরক্ষণে আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান ডাকসু ভিপি।

অনুষ্ঠানের শুরুতে কোরআন তেলাওয়াত করেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ক্বারি আব্দুল্লাহ আল জাওয়াদ। পরে ইসলামি সংগীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী আহমেদ আতাউল্লাহ সালমান।