জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সিনেটে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট এবং ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের মূল বাজেট পাস করা হয়েছে। মূল বাজেট ও সংশোধিত বাজেটের পরিমাণ ৩৪৮ কোটি ৭০ লাখ পাঁচ হাজার টাকা ও ৩৪৮ কোটি ২৫ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। এবছর মূল বাজেটে সর্বনিম্ন বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সহায়তা খাতে ৭০ লাখ টাকা যা মূল বাজেটের ০.২০ শতাংশ । এর আগে এটি চলতি বছর ছিল ৬০ লাখ টাকা যা মোট বরাদ্দের ০.১৭ শতাংশ।
শনিবার (২৭ জুন) বিকেল ৪টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন প্রশাসনিক ভবনের সিনেট হলে অনুষ্ঠিত ৪৩তম বার্ষিক অধিবেশনে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আব্দুর রব বাজেট উপস্থাপন করেন।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট ও ২০২৬-২৭ সালের প্রস্তাবিত বাজেট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বেতন-ভাতা বাবদ সর্বোচ্চ ব্যয় রাখা হয়েছে। এ খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ২০১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এটি মোট বাজেটের ৫৭.৭৭ শতাংশ। চলতি অর্থ বছরের সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ ছিল ১৯৮ কোটি ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকা যা মোট বাজেটের প্রায় ৫৬.৯২ শতাংশ। বাজেটে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় ধরা হয়েছে পণ্য ও সেবা খাতে- ৭৮ কোটি ৩লাখ ৩৫ হাজার টাকা। এ খাতে মোট বাজেটের ২২.৩৮ শতাংশ খরচ হবে। চলতি অর্থবছরে সংশোধিত বরাদ্দ ছিল ৭০ কোটি ৮২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। যা মোট বরাদ্দের ২০.৩৪ শতাংশ।
তৃতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় ধরা হয়েছে পেনশন ও অবসর সুবিধা খাতে। এতে বরাদ্দ রয়েছে ৩৭ কোটি ১৪৪ লাখ টাকা যা মোট বরাদ্দের ১০.৬৫ শতাংশ। চলতি বছর এ খাতে ৪৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা অর্থাৎ ১২.৭০ শতাংশ বরাদ্দ ছিল।
এবারের বাজেটে গবেষণা ও উদ্ভাবন খাতে প্রস্তাবিত বাজেট রাখা হয়নি। চলতি বছর এটি ছিল নয় কোটি ২৩ লাখ-মোট বরাদ্দের ২.২৬ শতাংশ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ খাতের জন্য সরাসরি ইউজিসি থেকে অর্থ প্রদান করা হবে বলে জানা যায় ।
পণ্য ও সেবা (রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত) খাতে বরাদ্দ হয়েছে নয় কোটি ৪৭ লাখ টাকা, যা মোট বাজেটের ২.৭২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এখানে বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ১০ কোটি ৮১ লক্ষ টাকা, যা মোট বাজেটের ৩.১০ শতাংশ।
যানবাহন ক্রয় বাবদ প্রস্তাবিত বাজেটে মোট বাজেটের ০.৭০ শতাংশ অর্থাৎ দুই কোটি ৪৪ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অন্যান্য মূলধন জাতীয় বাবদ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এক কোটি টাকা যা মূল বাজেটের ০.২৯ শতাংশ। চলতি বছর এ খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল ৭০ লাখ, এটি মূল বাজেটের ০.২০ শতাংশ ছিল। অন্যান্য ব্যয় হিসেবে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে চার কোটি ২৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা, যা মোট বাজেটের ১.২৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এক হাতে বরাদ্দ ছিল চার কোটি ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এটি মূল বাজেটের ১.২২ শতাংশ ছিল। যন্ত্রপাতি খাতের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ১১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, যা মোট বাজেটের ৩.২৬ শতাংশ। চলতি বছর এটি ছিল ছয় কোটি ৬৮ লাখ টাকা যা মোট বাজেটের ১.৯২ শতাংশ। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বাবদ দুই কোটি ৮২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এটি মোট বাজেটের ০.৮১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ছিল দুই কোটি ৭০ লাখ যা মোট বাজেটের ০.৭৮ শতাংশ।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের মূল বাজেটের আয়ের খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে- বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের বা সরকারি মঞ্জুরি ৩১৬ কোটি ৭০ লাখ পাঁচ হাজার টাকা, ছাত্রছাত্রীদের থেকে প্রাপ্ত ফিস বাবদ পাঁচ কোটি ৩০ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ও ভর্তি ফর্ম বিক্রি থেকে আয় ১৮ কোটি ২৩ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। এছাড়াও বিভিন্ন চার্জ থেকে দুই কোটি ৯২ লাখ ৯০ হাজার টাকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি থেকে আয় ৩২ লাখ টাকা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য উৎস থেকে আয় পাঁচ কোটি ২১ লাখ ২৮ হাজার টাকা। ইউজিসির বরাদ্দ বাদে সব মিলিয়ে মোট নিজস্ব আয় ৩২ কোটি টাকা।
বাজেট পর্যালোচনায় আরো দেখা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মূল বাজেটে বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। অনুষদ ও বিভাগের শিক্ষা সরঞ্জাম খাতে ২০ লাখ টাকা এবং বিভাগ ও অফিস সমূহের কম্পিউটার, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফিল্ড ওয়ার্ক খাতে ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। খেলাধুলা ও পাঠ বহির্ভূত কার্যক্রম খাতে সংশোধিত বাজেটে ৫০ লাখ টাকা এবং মূল বাজেটে ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এছাড়াও একটি মাইক্রোবাস ও একটি অ্যাম্বুলেন্স, একটি এসি কোস্টার ও একটি বড় বাস ক্রয়ের জন্য মূল বাজেটে দুই কোটি ৪৪ লাখ ২০ হাজার টাকা সংস্থান রাখা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর নির্মাণের জন্য চলতি অর্থ বছরে তিন কোটি ৫০ লাখ এবং আগামী অর্থবছরে এক কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন বৈদ্যুতিক লাইনসমূহ পুনঃ স্থাপনের জন্য সংশোধিত বাজেটে দুই কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের যন্ত্রপাতি ক্রয় বাবদ মূল বাজেটে দুই কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের 'সেল জেনেটিক্স এন্ড প্ল্যান্ট বায়োটেকনোলজি' ল্যাব আধুনিকায়ন বাবদ এক কোটি ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
মেডিক্যাল সেন্টারের ওষুধপত্র, প্যথলজি কিটস ও যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষন খাতে ৭০.০০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আবাসিক ভবন মেরামত খাতে সংশোধিত বাজেটে দুই কোটি টাকা এবং মূল বাজেটে দুই কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। অনাবাসিক ভবন মেরামত খাতে সংশোধিত বাজেটে এক কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং মূল বাজেটে ২৫০.০০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে ।
এছাড়াও জাকসু ভাবন সংস্কারের জন্য মূল বাজেটে ৪৬ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরতন পানির লাইন সংস্কার ও একটি পাম্প স্থাপনের জন্য এক কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। দুইটি অনুষদ ভবনে দুইটি লিফট স্থাপন এবং প্রথম গ্রেড প্রাপ্ত অধ্যাপকগনের জন্য একটি করে ডেস্কটপ কম্পিউটার ক্রয় বাবদ প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। জীব বিজ্ঞান অনুষদের সকল ক্লাসরুমে স্মার্ট বোর্ড স্থাপন বাবদ দুই কোটি ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গবেষণা ও উদ্ভাবন খাতে সংশোধিত বাজেটে নয় কোটি ২৩ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বাজেট ঘাটতি ১০০ কোটি টাকা
প্রতি বছরেই বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন থেকে যে বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয় তার থেকে ব্যয়ের পরিমাণ বেশি হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজস্ব তহবিলে বাজেট ঘাটতি বেড়েই চলেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে এ ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯৯ কোটি সাত লাখ ৭০ হাজার টাকায়। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রমপুঞ্জিত বাজেট ঘাটতি ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে জানা যায় ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পট্রোলার মো: মোসানুল কবীর বলেন, ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি ১৫ কোটিরও বেশি হতে পারে। তবে জুন মাস শেষে প্রকৃত হিসাব চূড়ান্ত হবে। সে হিসাবে চলতি অর্থবছর শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রমপুঞ্জিত বাজেট ঘাটতি ১০০ কোটি টাকা অতিক্রম করবে।’
এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত ক্রমপুঞ্জিত ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৬১ কোটি ৯১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত ঘাটতি ছিল ৮০ কোটি ৩৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা। পরবর্তী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরো ১৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা ঘাটতি যুক্ত হওয়ায় মোট ঘাটতি বেড়ে ৯৯ কোটি সাত লাখ ৭০ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। চলতি অর্থবছরের হিসাব যুক্ত হলে এ ঘাটতি শতকোটি টাকা অতিক্রম করবে।
বাজেট উপস্থাপনকালে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, ‘বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে নৈতিক শিক্ষা ও সুশাসনের কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষার্থীদের শুধু জ্ঞান অর্জন করলেই হবে না, সহানুভূতি, সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধও গড়ে তুলতে হবে।’
এছাড়াও উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে একটি শক্তিশালী ও স্থায়ী উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠন প্রয়োজন। পাশাপাশি কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করতে কৃষি ও মেডিক্যাল অনুষদ চালুর বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়কে আধুনিক ও শিক্ষার্থীবান্ধব ডিজিটাল ক্যাম্পাসে রূপ দিতে অটোমেশন কার্যক্রম এগিয়ে চলছে।
বাজেট ঘাটতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সরকারি বরাদ্দ ও প্রকৃত চাহিদার মধ্যে ব্যবধান বাড়ায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আর্থিক সংকটে পড়ছে।’
এ সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নীতি প্রণয়ন এবং গবেষণাসহ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রকৃত ব্যয়ের ভিত্তিতে বরাদ্দ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের লক্ষ্যে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজও চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।



