জাবি প্রতিনিধি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ৫৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী শরীফ রওশানকে নেত্রকোনায় অপহরণ করে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ মিনারে এ বিক্ষোভ সমাবেশ করেন তারা।
জানা যায়, গত বুধবার (১০ জুন) সন্ধ্যায় নেত্রকোনা জেলার সাতপাই বাইপাস থেকে জাবি শিক্ষার্থী শরীফ রওশানকে তুলে নিয়ে পূর্বধলা উপজেলার ত্রিমোহনী এলাকায় নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনকারীরা তাকে বস্ত্রহীন করে আওয়ামী লীগের দলীয় স্লোগান এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে অশালীন স্লোগান দিতে বাধ্য করে। পরে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়।
ভুক্তভোগী শরীফ রওশান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ৫৪তম আবর্তনের শিক্ষার্থী। তিনি নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার বাসিন্দা। বিক্ষোভকারীরা এ ঘটনার দ্রুত বিচার দাবি করে তিন দফা দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলো হলো, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘটনার বিচার নিশ্চিত করা, ভুক্তভোগীর চিকিৎসা ব্যয় রাষ্ট্রকে বহন করা এবং জুলাই আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আইরিশ হাজং পুনম বলেন, “আমার বন্ধু শরীফের সাথে হওয়া অন্যায়ের বিচার চাই। আমার বন্ধু শরীফ একজন জুলাই যোদ্ধা হওয়ার কারণে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের দোসররা তাকে নির্মমভাবে শ্লীলতাহানি করে ভিডিও করে সেটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করার দুঃসাহস দেখিয়েছে। আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।”
বাংলা বিভাগের ৫৪তম আবর্তনের শিক্ষার্থী আব্দুল মান্নান বলেন, দেশের প্রতিটি অঙ্গনে নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কার্যক্রম প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলায় স্থানীয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আমাদের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ৫৪তম আবর্তনের বন্ধু শরীফ হোসেন রওশানের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও হেনস্তা করেছে।
এ ঘটনা জুলাই যোদ্ধাদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। স্পষ্ট ভাষায় বলছি, ভারত পলায়নকৃত মাফিয়া হাসিনাকে— সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি। We are the rebellion. আমরাই বিপ্লব, আমরাই বিদ্রোহ।
এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ভুক্তভোগীর চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে।
এদিকে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী শরীফ হোসেন গণমাধ্যমে জানান, তিনি ঈদে গ্রামের বাড়ি আসেন। গত মঙ্গলবার বিকেলে তিনি সদর উপজেলার লক্ষ্মীগঞ্জ গদাইকান্দি গ্রামে তার বড় বোন তানিয়া আক্তারের বাড়ি যান। সেখান থেকে ঘটনার দিন বিকেলে তিনি নেত্রকোনা–পূর্বধলা সড়কের বাইপাস মোড় এলাকায় ঘুরতে যান। সন্ধ্যার পর সেখান থেকে তিনি একটি ইজিবাইকে পূর্বধলা সদরের উদ্দেশে রওনা হন। পথে ত্রিমোহনী সেতু পার হয়ে সিন্দুররাটিয়া শালদিঘা এলাকায় এলে দুই যুবক তার পথ রোধ করে তাকে ইজিবাইক থেকে নামতে বললে নেমে পড়েন তিনি। পরে ওই যুবকেরা তাকে মাদক কারবারি বলে হেনস্তা করতে থাকেন।
শরীফ হোসেনের ভাষ্য, এ সময় ওই দুজনের সাথে আরেকজন অংশ নেন। তিনজন মিলে তাকে মাদক কারবারি ও জুলাই যোদ্ধা ট্যাগ দিয়ে নির্যাতন করতে থাকেন। মুক্তিপণ হিসেবে তার কাছে ২০ হাজার টাকা চাওয়া হয়। পরে তার সাথে থাকা ৫০০ টাকা ও বিকাশের মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা এনে মোট সাড়ে ১০ হাজার টাকা তাদের দেয়া হয়। ওই যুবকেরা যাওয়ার সময় শরীফের স্মার্টফোনটি নিয়ে যান। এ সময় তাকে বস্ত্রহীন করে ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়া হয়।
ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, শরীফ হোসেনকে বস্ত্রহীন করে বলানো হচ্ছে, ‘আমি একজন জুলাই যোদ্ধা, আমি আর জুলাই করতাম না। জুলাই...। আমি আগে ভুল করছি ছাত্রদের পক্ষে থাইক্কা। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।’ এ সময় বস্ত্রহীন অবস্থায় শরীফকে কাঁদতে দেখা যায়।
বিষয়ে নেত্রকোনার পূর্বধলা থানার ওসি মো. দিদারুল ইসলাম বলেন, ঘটনাস্থলটি সদর থানার আওতাভুক্ত নাকি পূর্বধলা থানার আওতাভুক্ত, তা নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি ছিল। আজকে ভুক্তভোগীকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। আমরা অভিযুক্তদের শনাক্ত এবং গ্রেফতারের চেষ্টা চালাচ্ছি ।
জাবির প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম রাশিদুল আলম বলেন, আমি নেত্রকোনার পুলিশ সুপারের সাথে কথা বলেছি এবং শরীফের পরিবারের সাথে যোগাযোগ হয়েছে। তারা থানায় অভিযোগ দায়ের করবেন বলে জানিয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে। অভিযোগ পাওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়েছে ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদ এবং একই ঘটনায় জাতীয় ছাত্রশক্তি বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দিয়েছে।



