জাবি প্রতিনিধি
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তের ঋণ শুধু আলোচনা সভা, বড় বড় বক্তৃতা কিংবা বই লেখার মাধ্যমে শোধ হবে না বলে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ভিসিঅধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান। তিনি বলেন, এ ঋণ শোধ করতে হলে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে সততা, নৈতিকতা ও আদর্শের চর্চা নিশ্চিত করতে হবে।
সোমবার (২৭ জুলাই) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান অডিটোরিয়ামের সেমিনার কক্ষে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে জাতীয় ছাত্রশক্তি জাবি সংসদ আয়োজিত ‘জুলাই : রক্তঋণের উত্তরাধিকার’ শীর্ষক আলোচনা সভা, লেখা প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে ভিসির সভাপতিত্ব নিয়ে সম্ভাব্য সমালোচনার প্রসঙ্গ তুলে অধ্যাপক কামরুল আহসান বলেন, ‘অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, জাতীয় ছাত্রশক্তির অনুষ্ঠানে ভিসি কেন সভাপতিত্ব করছেন। আমার কাছে জুলাই কোনো সংগঠনের বিষয় নয়, এটি একটি চেতনা। আমাকে যদি শুধু একজন অংশগ্রহণকারী হিসেবেও ডাকা হতো, তবুও আমি একই আনন্দ নিয়ে উপস্থিত হতাম।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘জুলাই আমার কাছে অনির্ধারিত ও প্রস্তুতিহীন একজন মানুষের ভিসিহিসেবে দায়িত্ব পালনের ইতিহাস। রাত গভীরে ভাঙা গাড়িতে আতঙ্ক নিয়ে টকশো থেকে ফেরার ইতিহাস। তাই কে আয়োজন করেছে, সেটি নয়; আলোচনার বিষয়বস্তুই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে পাওয়া শিক্ষার কথা উল্লেখ করে ভিসি বলেন, ‘জুলাই আমাদের শিখিয়েছে, ঐক্যবদ্ধ তরুণ শক্তির কাছে কোনো ফ্যাসিবাদ টিকতে পারে না। ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান—প্রতিবারই তরুণরা পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিয়েছে।’
অনুষ্ঠানে উপস্থিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত শিক্ষার্থী ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘আমাদের সামনে আহত কাজল বসে আছেন, সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে আছেন। এখানে শহীদ আলিফ ও শ্রাবণ গাজীর পরিবারও উপস্থিত আছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত রক্তদানের পরও আমরা কেন সেই আত্মত্যাগের যথাযথ প্রতিদান দিতে পারি না? কারণ আমরা যা বলি, তা বিশ্বাস করি না; যে অঙ্গীকার করি, সে অনুযায়ী চলি না।’
সততার চর্চার ওপর গুরুত্ব দিয়ে অধ্যাপক কামরুল আহসান বলেন, ‘আমি একটি প্রশাসনিক পদে এসে বুঝেছি, মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সৎ গুণের চর্চা। শুধু নিজেকে সৎ দাবি করলেই হবে না, ব্যক্তিজীবনেও সততার চর্চা থাকতে হবে। আপনি গোপনে অসৎ কাজ করে প্রকাশ্যে সততার কথা বললে সমাজ বদলাবে না।’
জুলাই আন্দোলনের ভয়াবহ সময়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ১৫ জুলাইয়ের হামলার সময় তিনি নিজেও শিক্ষার্থীদের সাথে ছিলেন। সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘সেদিন শিক্ষার্থীদের আর্তচিৎকার, হামলা এবং মৃত্যুভয়ের সেই দৃশ্য আমি কখনো ভুলতে পারব না। আমার পাশেই একজন সাংবাদিক রক্তাক্ত হয়েছিলেন, তার রক্ত আমার পাঞ্জাবিতে লেগেছিল।’
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তরুণরাই বারবার পরিবর্তন এনেছে, কিন্তু অভিভাবক প্রজন্ম বারবার ব্যর্থ হয়েছে। এর প্রধান কারণ সততার অভাব। নতুন প্রজন্মকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা মুখে যা বলবে, কাজে সেটিই বাস্তবায়ন করে।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের উপস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে ভিসি বলেন, ‘আমি তার মধ্যে ভবিষ্যতের নেতৃত্বের সম্ভাবনা দেখি। তবে কোনো একজন ব্যক্তি একা পরিবর্তন আনতে পারবেন না। তার চারপাশের মানুষদেরও সৎ, নির্লোভ ও নৈতিক হতে হবে।’
বক্তব্যের শেষ দিকে জুলাইয়ের চেতনাকে কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখার আহ্বান জানিয়ে অধ্যাপক কামরুল আহসান বলেন, ‘জুলাইয়ের চেতনার অনুষ্ঠানে আমাকে যদি দর্শক সারির শেষ আসনেও বসতে বলা হয়, আমি সানন্দে আসব। কারণ জুলাই আমার কাছে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নয়; এটি ন্যায়, সততা ও নৈতিকতার চেতনা। সব দল ও সংগঠনে নৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে। আমাদের একটাই অঙ্গীকার হওয়া উচিত—আমি যা বলি, তা-ই করব। তাহলেই শহীদদের রক্তের ঋণ কিছুটা হলেও শোধ করা সম্ভব হবে।’



