ঢাবিতে ফিলিস্তিন বিষয়ক আর্ন্তজাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত

‘আরব দেশগুলো ইসরাইলের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপন করছে। কিন্তু আপনাদের দেশের পাসপোর্ট দিয়ে এখনো ইসরাইলে প্রবেশ করা যায় না।’

ঢাবিতে ডাকসুর উদ্দ্যোগে ফিলিস্তিন বিষয়ক আর্ন্তজাতিক সেমিনার
ঢাবিতে ডাকসুর উদ্দ্যোগে ফিলিস্তিন বিষয়ক আর্ন্তজাতিক সেমিনার |নয়া দিগন্ত

ঢাবি প্রতিনিধি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) উদ্যোগে ‘ফ্রম দ্য রিভার টু দ্যা সি : ভয়েসেস ফ্রম প্যালেস্টাইন- এ্যান ইন্টারন্যাশনাল সেমিনার অন লিবারেশন অ্যান্ড জাস্টিস’ শীর্ষক আর্ন্তজাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সোমবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরসি মজুমদার অডিটোরিয়ামে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।

ওই সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন প্যালেস্টাইন স্কলারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নওয়াফ হাইল তাকরুরী, ধর্মতাত্ত্বিক, গবেষক এবং আইএফএমের প্রতিষ্ঠাতা ড. ইহসান সেনোসেক আফেন্দি, তুরস্কের রিবাত হিউম্যানিটেরিয়ান এইড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইয়্যিদ মেহমেত ডুমান, আল কুদস ওয়াকফ ফর হেল্প অ্যান্ড এডুকেশনের চেয়ারম্যান ড. জাকারিয়া খালিল, ডাকসুর ভিপি মো: আবু সাদিক কায়েম, ছাত্র পরিবহন সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ, কার্যনির্বাহী সদস্য মোহাম্মদ শাহীন ও কার্যনির্বাহী সদস্য আনাস ইবনে মুনির।

প্যালেস্টাইন স্কলারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নওয়াফ হাইল তাকরুরি বলেন, আমরা সবাই বায়তুল মাকদিসের বাসিন্দা। আপনাদের পূর্বপুরুষ সাইফুল আযম ইসরাইলের বিমান ধ্বংস করেছিল। এটাই প্রমাণ করে পবিত্র ভূমির আপনাদের সম্পর্ক কতটা দৃঢ়। আমি তার কবর জিয়ারত করার নিয়ত করেছি।

বাংলাদেশে সাথে ইসরাইলের কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আরব দেশগুলো ইসরাইলের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপন করছে। কিন্তু আপনাদের দেশের পাসপোর্ট দিয়ে এখনো ইসরাইলে প্রবেশ করা যায় না।

মুসলিমদের সাথে আল-আকসার সম্পর্কের ধর্মীয় গুরুত্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন, আল কুদস হলো সকল মুসলমানের শহর। তাই আমাদের উচিত সর্বদা কুদস নিয়ে চিন্তা করা। মাসজিদুল আকসা মুসলিমদের তৃতীয় পবিত্র স্থান এবং প্রথম কিবলা। এ ভূমির গুরুত্ব বোঝানোর জন্যই এটিকে মুসলিমদের প্রথম কিবলা বানিয়েছিলেন।

ইসরাইলের সাম্প্রতিক মানবতাবিরোধী রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ইসরাইল রায় প্রদান করেছে তারা ইচ্ছে করলেই ফিলিস্তিনি বন্দীদের হত্যা করতে পারে। আমি আপনাদের অনুরোধ জানাব, আপনারা এর প্রতিবাদে কর্মসূচি পালন করুন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুরোধ জানাব, তারা যেন ইসরাইল এই মানবতাবিরোধী রায়ের বিরুদ্ধে একটি আর্ন্তজাতিক সেমিনারের আয়োজন করে। সেমিনারে যেন বিশ্বের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। আমরা এক্ষেত্রে সকল ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।

তরুণ-তরুণীদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান, আপনারা প্রযুক্তি ব্যবহারে অনেক দক্ষ। আমরা এসব ব্যবহার করতে পারি না। আপনারা বুদ্ধিমান। আপনাদের মনে সর্বদা ফিলিস্তিনকে জাগ্রত রাখুন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আল-আকসার ইস্যুটিকে জাগ্রত রাখুন।

ধর্মতাত্ত্বিক, গবেষক এবং আইএফএমের প্রতিষ্ঠাতা ড. ইহসান সেনোকাক আফেন্দি বলেন, আমি মুহাম্মদ আল ফাতিহের তরফ থেকে সবাইকে সালাম জানাই। তুর্কির সাথে এ অঞ্চলের মানুষের সম্পর্ক অতি পুরাতন। ইখতিয়ারউদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি এ দেশে ১৮ জন মুজাহিদ নিয়ে এসেছিলেন। এ দেশের মানুষ তার ইসলামের দাওয়াত গ্রহণ করে। খিলাফাতের পতনের সময় আপনাদের পূর্ব পুরুষেরা আমাদের সহযোগিতা করেছিল। উম্মাতের খারাপ সময়ে আলেমদের ভূমিকা পালন করতে হয়। এমন বিপদে আমাদের ধৈর্য ধারণ করতে হবে। আমাদের ঈমান হতে হবে ইব্রাহিমের আ:-এর মতো। নমরুদ তাকে আগুনে নিক্ষেপ করলেও তিনি ধৈর্য ধারণ করেছিলেন। মুসলিমদের ওপর বিপদ এলে তারা ধৈর্যধারণ করে এবং বিশ্বাস রাখে এটি আল্লাহর তরফ থেকে এসেছে। পবিত্র ভূমির মানুষের ঈমানও এমন। তারা বিশ্বাস করে এই বিপদ ক্ষণস্থায়ী। পরকালে তাদের প্রিয়জনদের সাথে তাদের পুনরায় সাক্ষাৎ হবে। মুসলিমরা শুধু মাত্র আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখে। বদরের যুদ্ধে অল্প সংখ্যক মুমিনেরা বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করেছিল। শেখ ইজ্জুদ্দীন আল-কাসসাম, যার নামে হামাসের সামরিক শাখা আল-কাসসাম বিগ্রেডের নামকরণ করা হয়েছে তিনি ছিলেন একজন তুর্কি আলেম। যখন তাদের ওপর বিপদ আপতিত হয়েছিল। তখন তার নিকট অতি অল্প কয়েকজন ছাত্র ছিল। তারা সর্বাত্মকভাবে শত্রুদের মোকাবেলা করেছিলেন। মৃত্যু মুসলিমদের নিকট সেতুর মতো। এটি তাকে তার প্রিয় রবের নিকট নিয়ে যাবে।

ইসলামের সাম্যের বাণী উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাসূল সকল শ্রেণি-বর্ণ-গোত্র-জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। তার সাথে ছিল ক্রীতদাস বেলাল, ধনবান আবু বকর, পারস্যের সালমান ফারসি। এভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকলে আমরাও একদিন বিজয়ীর বেশে আল কুদসে প্রবেশ করতে পারব।

তিনি ফিলিস্তিন স্বাধীনতার আশা ব্যক্ত করে বলেন, আব্বাসী আমলের শেষে রাফেজিদের ফিতনা বেড়ে গিয়েছিল। তখন পশ্চিমারা বলত, মুসলিমরা এ সঙ্কট থেকে কখনো মুক্তি পাবে না। তখন একজন দরবেশ বাগদাদ থেকে তুর্কির দিকে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে একজন সেলজুকের সাথে তার দেখা হয়। এই ঘটনার মাধ্যমে সেলজুকরা ইমান আনে। এই সেলজুকদের হাতেই রাফেজিদের পতন ঘটে।

ডাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) মো: আবু সাদিক কায়েম বলেন, আরবি আরো ভালোভাবে এখানে উপস্থিত অতিথির সাথে আরো ভালোমতো কথা বলতে পারতাম। বায়তুল্লাহতে গেলে এই আপসোস আরো বেড়ে যায়। আমি শিক্ষার্থীদের অনুরোধ জানাব, আপনারা ইংরেজি এবং আরবিতে নিজেদের দক্ষ করে তুলুন। ফিলিস্তিন নিয়ে আমাদের কার্যক্রম অনেক কমে গিয়েছে। শুধু সভা-সেমিনার করে নয়, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, মিডিয়ার মতো প্রতিষ্ঠান তৈরি করে আমাদের ফিলিস্তিনের মুক্তিতে ভূমিকা রাখতে হবে। আমাদের ফিলিস্তিনের মুক্তির একটি রূপরেখা তৈরি করতে হবে।

ইসরাইলের মানবতাবিরোধী কার্যক্রমের নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা আমাদের নেতা ইসমাইল হানিয়া, ইয়াহিয়া সিনওয়ারদের হারিয়েছি। এছাড়াও পবিত্র ভূমিতে জায়নবাদীরা এখনো আমাদের ভাই-বোন এবং শিশুদের হত্যা করে যাচ্ছে। আমরা যখন ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ছিলাম তখন বাংলাদেশের পতাকার পাশাপাশি আমরা ফিলিস্তিনের পতাকাও ব্যবহার করতাম। আমরা আশা করি, খুব দ্রুত ফিলিস্তিন স্বাধীন হবে।

তুরস্কের রিবাত হিউম্যানিটেরিয়ান এইড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইয়্যিদ মেহমেত ডুমান বলেন, কথিত আছে, নমরুদের আগুন নেভাতে একটি ব্যাঙ মুখে সামান্য পানি নিয়ে এসেছিল। তখন নমরুদ তাকে জিজ্ঞেস করে, এই সামান্য পানি দিয়ে তুমি কী করবে? তখন ব্যাঙটি বলেছিল, আমার যতটুকু সার্মথ্য আমি করব। তেমনি এরূপ ছোট ছোট আয়োজন ফিলিস্তিনের মুক্তির ক্ষেত্রে উপকারী ভূমিকা পালন করবে। রিবাত ফিলিস্তিনের কল্যাণে দীর্ঘদিন যাবৎ কাজ করে যাচ্ছে।

আল কুদস ওয়াকফ ফর হেল্প অ্যান্ড এডুকেশনের চেয়ারম্যান ড. জাকারিয়া খালিল বলেন, আমি যত দেশেই যাই যখন বাংলাদেশে আসি তখন মনে হয় না আমি দেশের বাইরে আছি। মনে হয় যেন আমি আমার দেশের মানুষদের সাথেই আছি। ফিলিস্তিন ইস্যুটি শুধুমাত্র একটি মজলুম জাতি বা ধর্মীয় ইস্যু নয়। এটি আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু। এ ভূমিটি হলো নবীদের ভূমি। এই ভূমিতে অসংখ্য নবীর আগমন ঘটেছে। ফিলিস্তিন ইস্যুটি মুসলিম জাতির ঐক্যের ইস্যু। এই ইস্যুটিকে কেন্দ্র করেই মুসলিম জাতি ঐক্যবদ্ধ হবে। গাজার যুদ্ধ শুধুমাত্র ফিলিস্তিনবাসীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছিল না। এ যুদ্ধে মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছে। গাজার যুদ্ধের জন্য সেখানকার শিক্ষার্থীরা এবং বাসিন্দারা দীর্ঘদিন যাবৎ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। গাজায় প্রচুর মসজিদ, মাদরাসা ধ্বংসের শিকার হয়েছে। সেখানকার প্রায় ৯৬ হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষার্থী শিক্ষা বঞ্চিত। এই খারাপ অবস্থা আমাদের পারস্পরিক সহযোগিতা এবং ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দাবি রাখে। একজন মানুষ অনেক কিছু পরিবর্তন করতে পারে। গাজার যুদ্ধে একজন মানুষ বড় পরিবর্তন আনতে পারে। গাজার যুদ্ধপদ্ধতিতে ইখওয়ান এবং মিশরের আলেম শায়েখ ইউসুফ আল কারযাবি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।