শৈশবের রমজান থেকে হল জীবনের রোজা

প্রথম দিকে পরিবারের অভাব অনুভূত হলেও ধীরে ধীরে হলের বন্ধুরাই হয়ে ওঠে এক নতুন পরিবার।

শেফাক মাহমুদ, বুটেক্স

Location :

Dhaka
বন্ধুদের সাথে ইফতার
বন্ধুদের সাথে ইফতার |নয়া দিগন্ত

আলী জুনায়েদ, ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াকালীন থেকে যার রোজা রাখা শুরু। রমজান ঘিরে তার রয়েছে কতশত স্মৃতি, ভুলে ফল পেরে খাওয়া থেকে শুরু করে সাহরিতে সময়মতো না ওঠার কারণে নিয়ম করে মায়ের বকা খাওয়া। বছর ঘুরিয়ে বছর আসে, আর সাথে বারবার রমজানও ফিরে আসে তার জীবনে। ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে পবিত্র এই মাসের সাথে। সাহরিতে মায়ের বকা খেয়ে শুরু হলেও তার কাছে ইফতারের সময়টা ছিল সবচেয়ে আনন্দের। পরিবারের সাথে কাটানো মুহূর্ত আর বন্ধুদের সাথে সমুদ্রের পাড়ে বসে ইফতার, সবকিছু যেন এখনো তাকে এখনো টানে।

সেই জুনায়েদ বর্তমানে বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) ৫১তম ব্যাচের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী। আগের সবকটি রমজান পরিবারের সাথে কাটলেও এই প্রথম সে পরিবার ছেড়ে রমজান পালন করছেন।

হল শিক্ষার্থী হিসেবে তার রমজান কেমন কাটছে এই প্রশ্নের জবাবে আলী জুনায়েদ বলেন, ‘আগের পারিবারিক পরিবেশের থেকে হলের রমজান আলাদা হলেও এখানেও রয়েছে এক ধরনের সৌন্দর্য ও ঐক্য। বন্ধুদের সাথে ইফতার, বিভিন্ন ক্লাবের আয়োজন আর সহপাঠীদের ছোটখাটো হাসি-ঠাট্টায় ভরা মুহূর্ত।’

তবুও রমজান এলে তার মনে পড়ে যায় শৈশবের সেই দিনগুলো। সাহেরির সময় মা-বাবার বকা, বন্ধুদের সাথে ইফতার, আর নির্মল আনন্দে ভরা স্মৃতিগুলো। যা আজও তার কাছে ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর ভাষা হয়ে আছে।

মুনতাহসীন মাহমুদ মাহিন বুটেক্সের ৫০তম ব্যাচের ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যয়নরত আছেন। পরিবারের বাকি সদস্যদের রোজা রাখতে দেখে তিনিও বায়না ধরতেন রোজা রাখবে বলে। বেশ আগ্রহ আর উদ্দীপনা নিয়ে রোজা রাখলেও তা আর দুপুর পার হতো না। সবাই সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত একটা রোজা রাখলেও তার হয়ে যেতো দু’টি। ইফতারের সময় আবার তিনি থাকতেন সবচেয়ে প্রাণবন্ত। এভাবেই কাটে মাহিনের শৈশবের রমজানের দিনগুলো।

তিনি এখন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী। পরিবারের বাইরে কাটছে তার রমজান। পরিবারের সাথে নির্বিঘ্নে সাহরি-ইফতার কাটানো দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন মাহিন।

হলে তাকে সবচেয়ে বেশি বেগ পেতে হয় সাহরিতে। একটু দেরি হলে শেষ হয়ে যায় ক্যান্টিনের ভালো খাবার। আবার অন্যদিকে ডাইনিংয়ের খাবার হয় না মানসম্মত। কিন্তু ইফতারের সময়টা হয়ে ওঠে আনন্দঘন পরিবেশের। বন্ধুদের সাথে অথবা বিভিন্ন ইফতার মাহফিলের দাওয়াতে তৈরি হয় একেক স্মৃতি। সব মিলিয়েই চলছে হল শিক্ষার্থী হিসেবে মাহিনের রমজান।

তবে ৪৭তম ব্যাচের ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মোতাকাব্বির রহমানের গল্পটা বাকিদের থেকে আলাদা। বিশ্ববিদ্যালয়ের হল জীবনে কাটানো এটাই তার শেষ রমজান হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ চার বছরের পথচলা শেষে তার গ্র্যাজুয়েট হতে যাওয়ার বাকি কেবল কিছুদিন।

পরিবার ছেড়ে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের হল জীবনে এসে মোতাকাব্বির রমজানের অভিজ্ঞতা পেয়েছে নতুন মাত্রায়। প্রথম দিকে পরিবারের অভাব অনুভূত হলেও ধীরে ধীরে হলের বন্ধুরাই হয়ে ওঠে এক নতুন পরিবার। এখন হল জীবন শেষ হওয়ার কথা চিন্তায় আসলে মন ভারী হয়ে আসে তার।

হল জীবনে কাটানো দিনগুলোর স্মৃতি মনে করে তিনি বলেন, ‘হয়তো সামনে আরো অনেক রমজান আসবে। কিন্তু শৈশবের পারিবারিক রমজান আর বন্ধুদের সাথে কাটানো হল জীবনের এই দিনগুলোই ভবিষ্যতে স্মৃতির পাতায় সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। একসাথে বসে ইফতার করা, কাড়াকাড়ি করে ইফতারি মাখানো কিংবা সাহরির সময় গল্প করতে করতে খাওয়া এসব মুহূর্ত হল জীবনের রমজানকে ভিন্ন স্বাদ দেয়। ভালো সময়গুলো সত্যিই খুব দ্রুত ফুরিয়ে যায়, আর পরে সেগুলোই হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান গল্প।’

সুব্রত কুমার পাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৫০তম ব্যাচের সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থী। ছোটবেলা থেকেই তিনি শিখেছেন সব ধর্মের মানুষ এবং তাদের আচার ও অনুষ্ঠানকে সম্মান করা। এই শিক্ষাটা মূলত পেয়েছেন মায়ের কাছ থেকেই। তার মা সবসময় বলতেন, ‘সবাই মিলেমিশে থাকলেই জীবন সুন্দর হয়।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে এসে সেই শিক্ষার বাস্তব রূপ যেন আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তার কাছে। বিশেষ করে রমজান মাস এলেই হলের পরিবেশটা যেন অন্যরকম হয়ে যায়। বিকেল হলেই শুরু হয় ইফতারের প্রস্তুতি। কেউ খাবার আনতে থাকেন, কেউ প্লেট সাজান, আবার কেউ শুধু পাশে দাঁড়িয়ে গল্প করেন। ধীরে ধীরে সবাই একসাথে বসে আজানের অপেক্ষা করেন, আর আজান শোনার সাথে সাথে শুরু হয় সম্মিলিত ইফতার।

শৈশবে বাড়িতে থাকাকালীন ভাই-বোনরা মিলে তার মায়ের কাছে ইফতার খাওয়ার বায়না করলেও হল জীবনে তিনি খুঁজে পান ইফতারের এক ভিন্ন আনন্দ। কেউ একটু বেশি ক্ষুধার্ত হয়ে খাবারের দিকে তাকিয়ে আছেন, আবার কেউ হাসতে হাসতে বলে ওঠেন, ‘আর কত মিনিট বাকি?’ এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই তার ইফতারকে করে তোলে আরো প্রাণবন্ত।

সুব্রত জানান, হলে এমন দিন খুব কমই গেছে যেদিন তিনি বন্ধুদের সাথে ইফতার করেননি। ভিন্ন ধর্মের মানুষ হয়েও সবাই একসাথে বসে ইফতার করা, একে অপরের বিশ্বাসকে সম্মান করা এই বিষয়টিই তার কাছে সবচেয়ে সুন্দর মনে হয়। তার বিশ্বাস, এই মিলেমিশে থাকার সংস্কৃতিটা যদি সারা বছর ধরে রাখা যায়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ সত্যিই সবার জন্য হয়ে উঠতে পারে এক অনন্য মিলনের জায়গা।