প্রকৌশল শিক্ষার উন্নয়ন, বিস্তার ও বিকাশের লক্ষ্য নিয়ে প্রায় দুই যুগ আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকেই অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে চরম সমন্বয়হীনতা, শিক্ষক সংকট, অব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
শনিবার (৫ জুলাই) দুপুর ২টার দিকে ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন কলেজের শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী।
ময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সিভিল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সালমানুর রহমান সাব্বির বলেন,‘কলেজটির সবচেয়ে গভীরতম সমস্যার মূল হলো তীব্র শিক্ষক সংকট। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) প্রণীত নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানে একজন স্থায়ী অধ্যক্ষ এবং প্রতিটি বিভাগে একজন সহযোগী অধ্যাপক, একজন সহকারী অধ্যাপক এবং দুজন প্রভাষক থাকার কথা। কিন্তু আজ পর্যন্ত ময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে কোনো স্থায়ী অধ্যক্ষ নিয়োগ দেয়া হয়নি।’
শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, বরিশাল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগ পরিচালিত হচ্ছে কোনো সহযোগী অধ্যাপক ছাড়াই। ময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অবস্থা আরো করুণ। বর্তমানে মাত্র একজন প্রভাষক দিয়ে একটি সম্পূর্ণ বিভাগ পরিচালিত হচ্ছে, যিনি সম্প্রতি ৪২তম বিসিএস-এ সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। এ বিভাগের শতাধিক শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
একই বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী শিবাজি রায় মৃদুলের অভিযোগ, একটি আধুনিক প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অপরিহার্য ন্যূনতম ভৌত সুবিধাগুলোও এখানে অনুপস্থিত। কলেজে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই। ফলে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।
তাছাড়া, প্রতিষ্ঠার এত বছর পেরিয়ে গেলেও একটি সুপরিকল্পিত ক্যাফেটেরিয়া বা খাবারের পর্যাপ্ত স্থান নেই। এটি শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক এবং অস্বাস্থ্যকর একটি পরিবেশ তৈরি করেছে।
তিনি আরো জানান, এখানকার শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগকে সীমিত করে তুলেছে। আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন কার্যক্রমে কোনো অগ্রগতি না থাকায়, প্রতিষ্ঠানগুলো যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। এমনকি, বরিশাল ও মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজেও দক্ষ জনবল ও শিক্ষক নিয়োগের ব্যর্থতার কারণে কোনো কার্যক্রমই শুরু হতে পারেনি। যা রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। ল্যাবরেটরিতে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও দক্ষ ল্যাব ইন্সট্রাক্টরের অভাবে সেগুলো সঠিকভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এর ফলে সরকারের বিশাল বিনিয়োগ অকার্যকর হয়ে পড়ছে।
কম্পিউটার সাজেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী ফাহিম মুনতাসীর অনি ক্ষোভ ও শংকা প্রকাশ করে জানান, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক দায়িত্ব। কিন্তু ময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে কোনো প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র (মেডিক্যাল সেন্টার) বা জরুরি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা নেই। একাধিকবার শিক্ষার্থীদের অসুস্থতাজনিত কারণে চরম চিকিৎসাধীন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে।
শত শত প্রকৌশল শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জরুরি সেবার মৌলিক চাহিদা পূরণে কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা প্রতীয়মান। তার মতে, উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জরুরি পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা, নিরাপত্তা কিংবা প্রস্তুতির অভাবকে গুরুত্ব না দিয়ে পরীক্ষায় বসতে বাধ্য করা হয়েছে, যা অমানবিক আচরণের চরম দৃষ্টান্ত।
শিক্ষার্থীরা আরো বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হওয়ার কারণে ময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ভর্তি প্রক্রিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রযুক্তি ইউনিট’এর অধীনে পরিচালিত হয়। এই ভর্তি প্রক্রিয়া প্রকৌশল শিক্ষার মান ও বৈশিষ্ট্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করছেন। পূর্বে লিখিত পরীক্ষা এবং মানসম্মত ল্যাব প্র্যাকটিক্যাল থাকার নিয়ম থাকলেও বর্তমানে শুধুমাত্র এমসিকিউ পদ্ধতিতে পরীক্ষা হয়। এছাড়াও ভর্তির ন্যূনতম যোগ্যতা কমিয়ে জিপিএ ৩.৫ করা হয়েছে। যা প্রকৌশল শিক্ষার গুণগত মানকে হ্রাস করছে।
‘অধিভুক্তির নামে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ’একটি গুরুতর অভিযোগ, যেখানে বলা হচ্ছে যে, কিছু মানহীন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধিভুক্তি লাভ করেছে, যাদের নিজস্ব কোনো শিক্ষক নেই এবং প্রতিটি বিভাগে মাত্র ১-২ জন শিক্ষক দিয়ে চলছে। এর ফলে সরকারি প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানগুলোতেও শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে, যা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাবমূর্তি ও অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করছে।
শিবাজি রায় মৃদুল আরো বলেন, ‘প্রকৌশল শিক্ষার অন্যতম মূল লক্ষ্য হলো গবেষণা ও উদ্ভাবনী সৃজনশীলতা তৈরি করা। কিন্তু ময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে গবেষণা সহায়ক পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা অনুপস্থিত। এর ফলে শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী শক্তি ও গবেষণার আগ্রহ হ্রাস পাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে দেশের প্রকৌশল খাতের উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে শুধুমাত্র পরীক্ষা আয়োজন ও সনদ প্রদানের সীমিত ভূমিকায় রয়েছে। কারিকুলাম উন্নয়ন, শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন এবং প্রশাসনিক সহায়তার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা একেবারেই অনুপস্থিত। এর ফলে অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীরা যথাযথ সুযোগ ও সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পরীক্ষা ও ফলাফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা, অনিয়ম এবং অদক্ষতার কারণে শিক্ষার্থীরা তাদের সঠিক মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে।
এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ময়মনসিংহ, ফরিদপুর ও বরিশাল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরা চলতি বছরের ২০মে থেকে ক্লাস পরীক্ষা বর্জন করেছেন। বর্তমানে ময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং ও কম্পিউটার সাইন্সের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে মোট ৭২০ জন শিক্ষার্থী আছে। আর স্থায়ী অস্থায়ী মিলে যায় মোট ২২ জন শিক্ষক রয়েছেন।
শিক্ষার্থীরা সরকারের কাছে এই অচলাবস্থার দ্রুত নিরসনের জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান হিসেবে আর থাকতে চান না।
শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট করেছেন, তারা কোনো ধরনের জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করতে চান না তারা একটি শান্তিপূর্ণ ও গঠনমূলক শিক্ষার পরিবেশ ফিরে পেতে চান। তারা হুশিয়ারি দিয়েছেন যে, যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত সব সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তারা কঠোর কর্মসূচির দিকে যেতে বাধ্য হবেন, যার সম্পূর্ণ দায়ভার সরকারকে বহন করতে হবে।
এসব বিষয়ে ময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান রওনক আরা চৌধুরী বলেন,‘সরকারি প্রতিষ্ঠান সরকারি নীতিমালা মেনে চলে। ছাত্ররা তাদের দাবি জানিয়েছে, আমরাও একাত্মতা পোষণ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়গুলো অবহিত করেছি। কিন্তু ক্লাস পরীক্ষা বর্জন করে সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। শিক্ষক সংকট আছে তবে, নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান আছে।’
অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. প্রকৌশল মো: মিজানুর রহমান জানান, যারা ক্লাস পরীক্ষা বর্জন করেছে তারা আর পরীক্ষা দিতে পারবে না। অন্য ব্যাচের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (বিআইটি) এর অধীনে শিক্ষার্থীরা যেতে চাচ্ছে। শিক্ষক সংকটসহ অন্য প্রশাসনিক বিষয়গুলো সরকার দেখবে।



