ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সমাজকল্যাণ বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা হত্যার বিচারের দাবিতে যৌথ মানববন্ধন করেছে বিএনপিপন্থী শিক্ষক সংগঠন ইউট্যাব, জিয়া পরিষদ ও জামায়াতপন্থী শিক্ষক সংগঠন গ্রীণ ফোরাম।
রোববার (৮ মার্চ) বেলা ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবন চত্বরে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। এ সময় প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিবৃন্দ, নিহতের স্বামী ও চার শিশু সন্তানসহ রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনগুলো কর্মসূচিতে অংশ নেয়।
মানববন্ধনে হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন ভিসি অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ, প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. এম এয়াকুব আলী, ট্রেজারার অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মনজুরুল হক, প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান, ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলাম।
এ সময় ইউট্যাবের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক ড. গফুর গাজী, জিয়া পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ড. ফারুকুজ্জামান খান, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম, গ্রীণ ফোরামের সেক্রেটারি অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমানসহ অর্ধশতাধিক শিক্ষক এবং রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের শাখা ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণ করেন।
মানববন্ধনে শিক্ষকরা বলেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় এমন নির্মম হত্যাকাণ্ড আমাদের সবার জন্য উদ্বেগের বিষয়। আমরা সরকারের নিকট এর সুষ্ঠু বিচার চাই। এক্ষেত্রে প্রশাসনের সর্বোচ্চ সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। আর যেন এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তির না ঘটে, তার জন্য সার্বিক নিরাপত্তাসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
গ্রীণ ফোরামের সেক্রেটারি অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘নিজ কক্ষে বসে থেকে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক, আমরা এই হত্যার সাথে সংশ্লিষ্ট সবাইকে চিহ্নিত করে দ্রুত বিচারের দাবি জানাই। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে দিনমজুর হিসেবে কাজ করে তাদের আইডি কার্ডের ব্যবস্থা করার দাবি জানাই।’
ইউট্যাবের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক ড. গফুর গাজী বলেন, ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাজিদ আব্দুল্লাহ হত্যার রক্তের দাগ মুছতে না মুছতে আরেকটি হত্যাকাণ্ড ঘটে গেল। অনতিবিলম্বে এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রশাসনকে নিশ্চিত করতে হবে।’
জিয়া পরিষদের সভাপতি প্রফেসর ড. ফারুকুজ্জামান খান বলেন, ‘১৯৯৫ সাল থেকে অসংখ্যবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা হেনস্তার শিকার হয়েছে, কিন্তু এর কোনো সুষ্ঠু বিচার হয়নি। কিছুদিন আগে আমাদের এক শিক্ষার্থী সাজিদের হত্যা হয়েছে। এখন পর্যন্ত সন্দেহভাজন কাউকে চিহ্নিত করা যায়নি। সাজিদ হত্যায় যতটুকু অগ্রগতি হয়েছে তাতে কেউই সন্তুষ্ট নয়। অপরাধী যদি বুঝতে পারে এইখানে অপরাধ করলে বিচার হয় না, সে তো লাগাতার অপরাধ করবে। প্রশাসনকে বলতে চাই, এসব হত্যায় যতদূর পর্যন্ত আগাতে হয় আপনারা আগান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ঐক্যবদ্ধভাবে আপনাদের পাশে আছে।’
মানববন্ধনের সভাপতি অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘যখন ঘটনা শুনলাম তখন বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আসলে আমি শোকাহত, মর্মাহত। সব বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করে আমি বলতে চাই, অতি দ্রুত সময়ে সাদিয়ার হত্যাকারীকে আইনের আওতায় এনে তার শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। এই ছুটির মাঝে যদি বিচার দৃশ্যমান না হয়, তাহলে আমরা বড় কর্মসূচি দিতে বাধ্য হব।’
এছাড়া তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটা তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। সেই তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে আমি নিজেই আছি। আমি দল-মত নির্বিশেষে নিরপেক্ষভাবে, পরিচ্ছন্নতার সাথে এবং একদম স্বচ্ছভাবে এই তদন্ত কার্যক্রম দ্রুত সময়ের মধ্যে রিপোর্ট দেয়ার চেষ্টা করব।’
ভিসি প্রফেসর ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, ‘অধ্যাপক আসমা সাদিয়ার হত্যাকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার খুবই মর্মাহত। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় একজন আদর্শ শিক্ষককে হারিয়েছে। তার নির্মম হত্যার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক ঐক্যবদ্ধ। আমরা জানি, পরিবার থেকে এ হত্যার বিচারে মামলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকেও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আসমা সাদিয়ার হত্যার বিচার নিশ্চিতে প্রশাসন থেকে যেভাবে, যতটুকু সহযোগিতা করার প্রয়োজন হয়, প্রশাসন তার সর্বোচ্চটুকু করবে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারে নতুন করে ক্যাম্পাসকে ঢেলে সাজাবো।’
এ সময় নিহতের স্বামী ইমতিয়াজুর সুলতান তার স্ত্রীর জন্য শিক্ষক-কর্মকর্তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং দ্রুত সুষ্ঠু বিচারের প্রত্যাশা করেন।
পরে বাদ জোহর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে নিহত শিক্ষিকার রূহের মাগফেরাত কামনায় দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। এরপরে বিশ্ববিদ্যালয় গগণ হরকরায় নিহত শিক্ষিকা সাদিয়ার স্মরণে শোকসভার আয়োজন করে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ।
উল্লেখ্য, বুধবার (৪ মার্চ) ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মচারীর ছুরিকাঘাতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার ইবি থানায় অভিযুক্ত কর্মচারী ফজলুর রহমানকে প্রধান আসামি করে চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন নিহতের স্বামী ইমতিয়াজুর সুলতান। পরদিন আসামি ফজলুর রহমানকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সাবেক কর্মচারী ও উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দিকা হলের সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস, সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার এবং একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাবিবুর রহমানকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।



