ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে শিক্ষার্থীর ওপর প্রভোস্টের বর্বর নির্যাতন এবং প্রশাসনের মদদে ছাত্রদলের সন্ত্রাসী হামলার অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। সেইসাথে এই নির্যাতন ও সন্ত্রাসী হামলার তীব্র প্রতিবাদ করেছে সংগঠনটি।
সোমবার (১৭ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্যে এসব অভিযোগ ও প্রতিবাদ জানানো হয়।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখার সভাপতি মুহা. মহিউদ্দিন খান স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে গতরাতে যে বীভৎস, অমানবিক ও নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে, তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে।
ছাত্রশিবিরের লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পতনের পর নতুন, নিরাপদ ও স্বাধীন ক্যাম্পাসের যে স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, গতকালের ঘটনা প্রমাণ করেছে সন্ত্রাসীদের কেবল চেহারাই বদলেছে, চরিত্র বা কাঠামো বদলায়নি।
সংগঠনটি ওই ঘটনায় হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. ইলিয়াস আল মামুন এবং নব্য ছাত্রলীগে পরিণত হওয়া ‘ছাত্রদল’কে দায়ী করে।
প্রভোস্টের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ
লিখিত বক্তব্যে ছাত্রশিবির দাবি করে, হলের খাবারের মান নিয়ে যৌক্তিক সমালোচনা করে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেয়ায় একজন সাধারণ আবাসিক শিক্ষার্থীকে নিজের রুমে ডেকে নেন ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. ইলিয়াস আল মামুন। রুমে ঢোকার পর ওই শিক্ষার্থীর কাছ থেকে জোরপূর্বক মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়া হয়।
এরপর প্রভোস্ট তার অনুগত স্টাফদের—ইলেকট্রিশিয়ান মারুফ, প্রধান সহকারী আরিফ হোসেনসহ আরো চার থেকে পাঁচজনকে দিয়ে—রুমের দরজা বন্ধ করে টানা দেড় ঘণ্টা ওই শিক্ষার্থীর ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালান বলে অভিযোগ করা হয়।
ছাত্রশিবিরের দাবি, ছাত্রত্ব ও সিট বাতিলের হুমকি এবং সাইবার মামলা দেয়ার ভয় দেখিয়ে প্রভোস্ট নিজের হাতে একটি মিথ্যা স্ক্রিপ্ট লিখে ওই শিক্ষার্থীকে দিয়ে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করিয়ে নেন।
ওই জোরপূর্বক নেয়া জবানবন্দিতে ফজলুল হক হল সংসদের ভিপি, জিএস ও এজিএসের প্ররোচনায় শিক্ষার্থী ওই পোস্ট দিয়েছে—এমন কথা লেখানো হয় বলে দাবি সংগঠনটির।
লিখিত বক্তব্যে আরো বলা হয়, ভয়ের চোটে ও ট্রমায় শিক্ষার্থী যখন কাঁদছিল, তখন তাকে এ ঘটনা বাইরে প্রকাশ না করার জন্য হুমকি দেয়া হয়। এমনকি ইইই বিভাগের আরেক শিক্ষার্থীকেও একইভাবে ‘শায়েস্তা’ করার দম্ভোক্তি করেন প্রভোস্ট—এমন অভিযোগও করা হয়।
সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে প্রশাসনের বিরুদ্ধে টালবাহানার অভিযোগ
ঘটনার পর ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও হল সংসদের প্রতিনিধিরা প্রভোস্ট এবং জড়িত কর্মচারীদের বিচার চেয়ে সিসিটিভি ফুটেজ দেখার দাবি জানান বলে লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়।
ছাত্রশিবিরের অভিযোগ, প্রশাসন টানা সাত ঘণ্টা শিক্ষার্থীদের দাঁড় করিয়ে রেখে কালক্ষেপণ করে। কখনো বলা হয় ভিডিও করা যাবে না, কখনো ১০-১২ জন দেখতে পারবে, এরপর তা কমিয়ে তিন থেকে চারজন এবং শেষে মাত্র দু’জন—ভুক্তভোগী ও ভিপি—দেখতে পারবেন বলে জানানো হয়।
শিক্ষার্থীরা প্রতিটি শর্ত মেনে নেয়ার পরও ঘটনাস্থলে উপস্থিত দুই প্রো-ভিসি উল্টো শিক্ষার্থীদের দোষারোপ করে ফুটেজ না দেখিয়েই চলে যেতে চান বলে অভিযোগ করা হয়।
নব্য ছাত্রলীগের ভূমিকায় ছাত্রদল এবং বর্বরোচিত হামলা
লিখিত বক্তব্যে ছাত্রশিবির দাবি করে, শিক্ষার্থীরা ঘটনার সুরাহা দাবি করার সময় ছাত্রদল সেখানে উপস্থিত হয়। সংগঠনটির অভিযোগ, অতীতে প্রভোস্ট বা ভিসিকে ঘিরে সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করলে ছাত্রলীগ যেভাবে রড-স্ট্যাম্প নিয়ে হামলা করে প্রশাসনকে ‘সেফ এক্সিট’ দিত, গতকাল রাতেও একই কায়দায় ফজলুল হক হল অফিস থেকে প্রো-ভিসি ও প্রক্টরকে উদ্ধার করে নিয়ে যায় ছাত্রদল।
প্রশাসনকে বাঁচানোর এই মিশনে শহীদুল্লাহ হল ছাত্রদল ও ফজলুল হক হল ছাত্রদল যৌথভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেছে ছাত্রশিবির।
সংগঠনটির দাবি, ওই হামলায় ফজলুল হক হলের ভিপি খন্দকার মো: আবু নাঈম, জিএস ইমামুল হাসান, পাঠকক্ষ সম্পাদক মো: তায়েফ, মুজিব হলের জিএস আহমেদ আল সাবাহ এবং শহীদুল্লাহ হলের সমাজসেবা সম্পাদক সাজু মিয়া মারাত্মকভাবে আহত হন। শ্বাসকষ্টসহ গুরুতর অবস্থায় ইমামুল হাসানসহ প্রায় ২০ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
লিখিত বক্তব্যে ছাত্রশিবির আরো অভিযোগ করে, একটি ছাত্রসংগঠন হিসেবে ছাত্রদলের উচিত ছিল নির্যাতিত শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ানো। কিন্তু তারা তা না করে একজন নিপীড়ক প্রভোস্টকে বাঁচাতে নিজেদের সহপাঠীদের ওপর ছাত্রলীগের মতো হামলা চালিয়েছে।
সংগঠনটির আশঙ্কা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবারো একদলীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে বিএনপির নিয়োগকৃত প্রশাসন ও বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল।
ছাত্রশিবিরের দাবি, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পতনের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ছাত্রদল নব্য ছাত্রলীগের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে দেশব্যাপী ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে।
লিখিত বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহবাগ থানায় হামলা, শহীদুল্লাহ হলের প্রভোস্টের রুমে ঢুকে তাণ্ডব এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা আলিয়া, চট্টগ্রাম, ঢাকা পলিটেকনিক ও তিতুমীর কলেজের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদলের হামলার অভিযোগও করা হয়।
এছাড়া হাসপাতালেও ঢুকে চিকিৎসাধীন আহত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রদল হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ছাত্রশিবির।
সংগঠনটির ভাষ্য, ছাত্রদলের এই পরিকল্পিত সন্ত্রাস শিক্ষাঙ্গনে নতুন ফ্যাসিজম কায়েমের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।
‘শিবির-ছাত্রদল সঙ্ঘাত’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই
ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে বলা হয়, ছাত্রদলের একপক্ষীয় হামলাকে কোনোভাবেই ‘শিবির-ছাত্রদল সঙ্ঘাত’ হিসেবে সরলীকরণ করার সুযোগ নেই।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, যারা হামলা করেছে তারা ছাত্রদলের সন্ত্রাসী, আর যাদের ওপর হামলা হয়েছে তারা শিক্ষার্থী ও তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি।
চার দফা দাবি ছাত্রশিবিরের
সংবাদ সম্মেলনে চার দফা দাবি তুলে ধরে ছাত্রশিবির।
প্রথম দাবিতে বলা হয়, একজন শিক্ষার্থীকে অবরুদ্ধ করে মানসিক নির্যাতনকারী, জোরপূর্বক মিথ্যা জবানবন্দি আদায়কারী এবং ছাত্রদলকে ডেকে এনে শিক্ষার্থীদের ওপর সন্ত্রাসী কায়দায় হামলা করানোর অভিযোগে ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্ট ড. ইলিয়াস আল মামুনকে আজীবনের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতে হবে এবং তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
দ্বিতীয় দাবিতে শিক্ষার্থীর গায়ে হাত তোলা ও মোবাইল কেড়ে নেয়ার ঘটনায় জড়িত স্টাফ মারুফ ও আরিফ হোসেনসহ অন্যদের চাকরিচ্যুত করার দাবি জানানো হয়।
তৃতীয় দাবিতে সিসিটিভি ফুটেজ ও ভিডিও এভিডেন্স দেখে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকারী ছাত্রদলের চিহ্নিত নেতাকর্মীদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ী বহিষ্কার এবং তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার দাবি জানানো হয়।
চতুর্থ দাবিতে শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির মুখে কোনো ছাত্রসংগঠন যেন পেশিশক্তি ব্যবহার করে প্রশাসনের লাঠিয়াল হিসেবে কাজ করতে না পারে, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের লিখিত গ্যারান্টি দাবি করা হয়।
লিখিত বক্তব্যের শেষাংশে সংগঠনটির পক্ষ থেকে আরো বলা হয়, অনেক রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে ক্যাম্পাসকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করা হয়েছে। সন্ত্রাসীদের শুধু সাইনবোর্ড বদল হবে, আর কাজ আগের মতোই থাকবে—এটি তারা মেনে নেবেন না। আহত শিক্ষার্থীদের রক্ত এখনো শুকায়নি। ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষার্থী ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির রাজপথ ছাড়বে না।
এ সময় সংগঠনটির পক্ষ থেকে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়, ‘একদিন এই ক্যাম্পাসে শান্তি আসবেই, ইনশাআল্লাহ।’



