নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের দোসর হাসান মোহাম্মদ রোমানের পূনর্বাসন, চাকসু নেতৃবৃন্দকে সাইবার বুলিং ও ক্রমাগত হুমকি, মিডিয়ার নির্জলা মিথ্যাচার এবং নিয়োগ ইস্যুসহ সাম্প্রতিক বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু)।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) দুপুরে চাকসু কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে চাকসু ভিপি ইব্রাহীম হোসেন রনিসহ চাকসু নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২০২৪ এর ছাত্র-জনতার গণবিপ্লবে ফ্যাসিস্ট, খুনী হাসিনা পলায়ন করলেও তার দোসররা প্রত্যেকেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পূর্বের ন্যায় অবস্থান করছিলো। যারা গত ১৬টি বছর শিক্ষার্থীদের উপর নির্যাতন, গণতান্ত্রিক আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের জঙ্গী ট্যাগ দিয়ে বহিষ্কার, শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে মাদক সেবন, মাদক সেবনে শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধকরণ, বিরোধী মতের শিক্ষার্থীদের পরিক্ষায় নাম্বার কম দেয়া, খুনী হাসিনার পক্ষে বয়ান তৈরি, অবৈধ তিনটি জাতীয় নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে গণতন্ত্র হত্যায় সহযোগীতাসহ সর্বশেষ চব্বিশ বিপ্লবে জনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে খুনী হাসিনাকে সহযোগিতা করেছে। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর এমন সব কথিত শিক্ষাকদের বিরুদ্ধে আমরা প্রশাসনের কাছে প্রমাণসহ অভিযোগ জানিয়েছিলাম। কিন্তু প্রশাসন তদন্তের নাম করে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, চাকসু নির্বাচনের পর থেকেই আমরা এমন সব কথিত নামধারী শিক্ষকদের ক্যাম্পাসে পুনর্বাসনের ব্যাপারে সোচ্চার ছিলাম। যারা অতীতে শিক্ষার্থীদের ওপর নিপীড়ন চালিয়েছে, সরাসরি সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সাথে জড়িত ছিল এবং ছাত্রলীগকে সাথে নিয়ে ক্যাম্পাসে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে। হাসান মোহাম্মদ রোমান শুভ তাদের মধ্যে অন্যতম।
নির্বাচনের পূর্বে আইন অনুষদের একটি সেমিনারে রোমান শুভর উপস্থিতির ছবি আমাদের নজরে এলে এখনকার চাকসু প্রতিনিধিদের কয়েকজন স্বশরীরে আইন অনুষদের ডিনের কাছে গিয়ে এর ব্যাখ্যা দাবি করি। গুরুতর সব অভিযোগ থাকার পর তদন্ত চলাকালীন অবস্থায় কেউ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে যুক্ত হতে পারে না। সে সময় আমাদের আশ্বস্ত করা হয় যে, রোমান শুভ ক্যাম্পাসে আর ফিরবেন না।
কিন্তু সম্প্রতি ভর্তি পরীক্ষাসমূহ চলাকালে আমরা নিশ্চিত তথ্য পাই যে, রোমান শুভ হল গার্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। উপ-ইউনিট পরীক্ষার সময় আইন অনুষদে কেন্দ্র না থাকায় সে দৃশ্যমান না হলেও, সর্বশেষ গত ১০ জানুয়ারি বি ইউনিট পরীক্ষার দিন তার উপস্থিতি নিশ্চিত হলে চাকসু নেতৃবৃন্দ আইন অনুষদের ডিনের কাছে উপস্থিত হন। বিষয়টি টের পেয়ে রোমান শুভ কোনো কারণ ছাড়াই আইন অনুষদ থেকে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। এ সময় চাকসু প্রতিনিধিরা তাকে ধরে করে প্রশাসনের কাছে অর্থাৎ প্রক্টর অফিসে হস্তান্তর করেন।
আমরা সেদিন বারবার প্রশাসনের কাছে তার বিরুদ্ধে বিদ্যমান অভিযোগের আলোকে মামলার অনুরোধ জানাই। কিন্তু প্রশাসন মামলা করেনি। এর মধ্যেই কয়েকটি জাতীয় গণমাধ্যম দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে এই ঘটনাকে ‘মব’ আখ্যা দিয়ে একটি ভ্রান্ত ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত ন্যারেটিভ দাঁড় করানোর চেষ্টা করে। পাশাপাশি একটি শিক্ষক সংগঠন প্রকাশ্যেই অভিযুক্তের পক্ষে অবস্থান নেয়। এই ঘটনাকে ঘিরে উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রশাসনের নিয়োগ সংক্রান্ত আলাদা ইস্যুর সাথে বিষয়টিকে জড়িয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়, যা সম্পূর্ণ অসত্য ও অসৎ উদ্দেশ্যপ্রসূত।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, চাকসু গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছে যে, প্রথম আলো, সমকালসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এমন কিছু সংবাদ প্রকাশ করেছে, যা বাস্তব ঘটনার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।
চাকসু নেতারা বলেন, তাকে প্রশাসনের কাছে হস্তান্তরের এই পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের শারীরিক নির্যাতন, হেনস্থা কিংবা সহিংস আচরণ সংঘটিত হয়নি-যার প্রমাণ উপস্থিত সাংবাদিকদের ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে বলা চাকসুর অবস্থান পরিষ্কার-পূর্বে যেমন ছিল, আগামীতেও তেমনই থাকবে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা পিছু হটবো না।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, চাকসু গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ ও তীব্র নিন্দার সঙ্গে জানাচ্ছে যে, নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগসাজসের অভিযোগে অভিযুক্ত হাসান মোহাম্মদ রোমানকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ছেড়ে দেয়ার প্রক্রিয়ায় প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে চাকসুর সহ-ছাত্রীকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক ও অন্যান্য নারী নেতৃবৃন্দকে লক্ষ্য করে একটি পরিকল্পিত, সংঘবদ্ধ ও ধারাবাহিক সাইবার বুলিং, চরিত্রহনন ও হুমকির অভিযান চালানো হচ্ছে। বিষয়টি শুধু মানহানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর সাথে যুক্ত হয়েছে প্রকাশ্য হত্যার হুমকি, শারীরিক ক্ষতির ইঙ্গিত ও ভয়ভীতি প্রদর্শন-যা সরাসরি ফৌজদারি অপরাধের আওতাভুক্ত। শুধু অশ্লীল গালিই নয়, নারী নেতৃবৃন্দের নামে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার করে অশ্লীল ভিডিও অনলাইনে প্রচার করছে। ঘৃণা, গুজব ও হুমকির মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতি ও ছাত্র প্রতিনিধিদের কলুষিত করার যে অপচেষ্টা চলছে, চাকসু তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
চাকসুর পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অবিলম্বে এই সাইবার বুলিং, হুমকি ও উসকানির সাথে জড়িত ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট পেইজগুলোকে শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।



