একটি প্রাগ্রসর, আলোকিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে গুণগত শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই উল্লেখ করে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. এস এম এ ফায়েজ বলেছেন, ‘উচ্চমানের শিক্ষা যুবসমাজের ক্ষমতায়ন করে, অসাম্য কমায় এবং জাতিকে শক্তিশালী করে।’
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) সকালে কুমিরাস্থ স্থায়ী ক্যাম্পাসে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) ষষ্ঠ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আইআইইউসি’র চ্যান্সেলর ও রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি হিসেবে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ অভিমত ব্যক্ত করেন।
ড. এস এম এ ফায়েজ বলেন, ‘উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। গত এক দশকে উচ্চশিক্ষা একটি বহুমাত্রিক পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। যা বিপুলসংখ্যক যুবককে বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষা গ্রহণ করে জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখতে সক্ষমতা দান করছে। বিশ্ববিদ্যালয় একটি কেন্দ্রের মতোই সেবা দান করে, যেখানে জ্ঞানের সৃষ্টি ও প্রয়োগ হয়।’
তিনি বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যোগ্য, সৎ ও নৈতিকতা-সচেতন নাগরিক উপহার দেয়ার মিশন ও ভিশনে আইআইইউসি এখনো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রয়েছে। জাতীয় অগ্রগতি ও টেকসই উন্নয়নের জন্য শিক্ষা একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। একটি প্রাগ্রসর আলোকিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে গুণগত শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। ব্যয় নির্বাহযোগ্য উচ্চমানের শিক্ষা যুবসমাজের ক্ষমতায়ন করে, অসাম্য কমায় এবং জাতিকে শক্তিশালী করে।’
এতে সমাবর্তন বক্তা ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. সালেহ হাসান নাকিব। স্বাগত বক্তব্য রাখেন আইআইইউসি’র ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আলী আজাদী। বক্তব্য রাখেন বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান, সাবেক সংসদ সদস্য আ. ন. ম. শামসুল ইসলাম।
মঞ্চে আরো উপস্থিত ছিলেন বোর্ড অব ট্রাস্টিজের ভাইস চেয়ারম্যান মুহাম্মদ শাহজাহান। ধন্যবাদ সূচক বক্তব্য রাখেন আইআইইউসি’র ট্রেজারার এবং সমাবর্তনের কো-কনভেনার প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান।
সভাপতির বক্তব্যে প্রফেসর ড. এস এম এ ফায়েজ বলেন, ‘সমাবর্তন একটি একাডেমিক ঐতিহ্য। এটি জাতীয় তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত। প্রত্যেক গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী দেশের ভবিষ্যতের বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে। এমনকি নেতৃত্বের পরবর্তী প্রজন্মের, পেশাজীবী ও উদ্ভাবকদেরও। এই সমাবর্তন গ্র্যাজুয়েট ও তাদের পরিবারের জন্য একটি গৌরবময় মুহূর্ত। পাশাপাশি একটি নতুন ও বৃহত্তর দায়িত্বের সংকেত। যেখানে জ্ঞানকে প্রজ্ঞার সাথে প্রয়োগ করতে হবে, দক্ষতাকে নৈতিকতার আলোকে পরিচালিত হতে হবে।’
সমাবর্তন বক্তা রাবি ভিসি প্রফেসর ড. সালেহ হাসান নকিব বলেন, ‘সমাবর্তন কেবল একটি ডিগ্রির স্বীকৃতি নয়, বরং এটি জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। এখন থেকে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা কেবল পাঠ্যবই বা স্মৃতির নয়, বরং তাদের প্রজ্ঞা, বিচারবুদ্ধি ও নৈতিক মূল্যবোধের। বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তনশীল ও অনিশ্চিত। একদিকে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, ডেটা মাইনিং ইত্যাদির জয়জয়কার, অন্যদিকে নৈতিক অবক্ষয়, বিভাজন ও সংঘাত।’
তিনি উপস্থিত সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘জ্ঞান যখন নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন তা ধ্বংসাত্মক হতে পারে। বর্তমান বিশ্বের কেবল দক্ষ পেশাদার নয়, বরং নৈতিক চিন্তাবিদ এবং নীতিবান নেতৃত্ব প্রয়োজন।’
ড. সালেহ হাসান নকিব তার বক্তৃতায় ইসলামের সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের সমন্বয় তুলে ধরে বলেন, “ইসলামের প্রথম নির্দেশ ‘ইকরা’ বা পড়ো থেকেই বোঝা যায় যে ইসলাম জ্ঞানার্জনের ওপর কতটা গুরুত্ব দেয়। কোরআনের আয়াত বা নিদর্শনসমূহ মানুষকে মহাবিশ্ব, ইতিহাস এবং নিজের সত্তা নিয়ে গবেষণা ও চিন্তা করতে উৎসাহিত করে। ইসলামে জ্ঞান অর্জন করা হয় সত্যের সন্ধানে এবং সৃষ্টি জগতের সেবার জন্য, অহংকার বা আধিপত্য বিস্তারের জন্য নয়।”
সমাবর্তন বক্তা মুসলিম ইতিহাসের স্বর্ণযুগ স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘এক সময় মুসলিম বিজ্ঞানীরা আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। ইবনে আল-হাইথামকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির জনক হিসেবে গণ্য করা হয়। ইউরোপ যখন অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, তখন মুসলিম বিশ্ব বীজগণিত, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘ইসলাম ও বিজ্ঞানের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই; বরং মুসলিমদের পতন হয়েছে মেধাসম্পন্ন চিন্তা ও নৈতিক শাসন থেকে বিচ্যুত হওয়ার কারণে।’
ইসলামী জীবনব্যবস্থায় পৃথিবী রক্ষা এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা একটি আমানত বা পবিত্র দায়িত্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘খিলাফাহ’ বা প্রতিনিধিত্ব ও ‘আমানাহ’ বা বিশ্বাসের ধারণার মাধ্যমে মানুষকে পৃথিবীর উন্নয়ন করা এবং অপচয় রোধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রযুক্তির উদ্ভাবন কেন ও কীভাবে হচ্ছে- তার পেছনের নৈতিক উদ্দেশ্যটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (আইআইইউসি) কেবল চাকরিপ্রার্থী তৈরি করে না, বরং এমন মানুষ তৈরি করতে চায় যারা বিশ্ব সভ্যতায় অবদান রাখবে।’
গ্র্যাজুয়েটদের উদ্দেশ্যে সমাবর্তন বক্তা প্রফেসর ড. সালেহ হাসান নকিব বলেন, ‘কাজের ক্ষেত্রে সর্বদা ইসলামের মূলনীতির আলোকে ন্যায়বিচার, শ্রেষ্ঠত্ব, আমানতদারি এবং দয়া বজায় রাখতে হবে। একজন নীতিবান ইঞ্জিনিয়ার বা অর্থনীতিবিদ সমাজ পরিবর্তনে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারেন, তা মনে রাখতে হবে।’
বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান, সাবেক এমপি আ. ন. ম. শামসুল ইসলাম বলেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের উচ্চ শিক্ষার প্রসারে অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন। যার ফলে এ দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের অকাতরে বিদেশে পড়াশোনার জন্য পাড়ি জমানোর প্রবণতা অনেকাংশে কমে গেছে। আউআইইউসি এ ক্ষেত্রে প্রথম সারির কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অন্যতম। নৈতিক ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে একটি সৎ, যোগ্য ও চৌকষ প্রজন্ম তৈরির মহান লক্ষ্যে নিবিড় ভাবে কাজ করে যাচ্ছে আইআইইউসি। আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম একটি স্বকীয় ও ব্যতীক্রমধর্মী বিশ্ববিদ্যালয়, যেটি চট্টগ্রামে অভিভাবকদের প্রথম পছন্দ। এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশের নয় বরং মুসলিম উম্মাহর সম্পদ।’
স্বাগত বক্তব্যে আইআইইউসি’র ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আলী আজাদী বলেন, ‘সমাবর্তন কেবল ডিগ্রি প্রদানের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি জ্ঞান, অধ্যবসায়, শৃঙ্খলা ও নৈতিক দায়িত্ববোধের এক মহৎ উদযাপন।’
তিনি গ্র্যাজুয়েটদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘এই সমাবর্তনের মাধ্যমে গ্র্যাজুয়েটরা সমাজের মূল ধারায় পদার্পণ করলো। মনে রাখতে হবে, পৃথিবী দ্রুত পরিবর্তনশীল। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে শুধু একাডেমিক জ্ঞান যথেষ্ট নয়। সৃজনশীল হতে হবে, সৎ থাকতে হবে এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা মেনে চলতে হবে। দেশের সেবায় এবং মানবতার কল্যাণে আপনাদের জ্ঞান কাজে লাগাতে হবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। আইআইইউসি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কোয়ালিটি, জ্ঞান ও নৈতিকতার সমন্বয়ে, শিক্ষা ও ঈমানের সংযুক্তিতে—জীবনকে গড়ে তোলা- আজ আপনারা সেই মহান মিশনের দূত।’
তিনি বলেন, ‘ইসলামে শিক্ষা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য নয়; বরং অন্যকে আলোকিত করা ও সমাজে ইতিবাচক অবদান রাখার দায়িত্ব বহন করে।’



