গাকৃবিতে দেশের প্রথম খরা সহনশীল সয়াবিনের নতুন জাত উদ্ভাবন

উপকূলীয় চরাঞ্চলে সয়াবিন চাষের যেসব সীমাবদ্ধতা রয়েছে, এ জাত তা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম বিধায় কৃষি বিপ্লবে এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। প্রতি গাছে ৮০ থেকে ১০০টি ফল এবং বড় দানার কারণে এক হাজার বীজের ওজন প্রায় ২৩০ গ্রাম। সাধারণ জাতের তুলনায় এটি বেশি ফলন দিতে সক্ষমতা রাখায় হেক্টর প্রতি অনায়াসেই ৩ দশমিক ২ থেকে ৩ দশমিক ৮ টন ফলন পাওয়া যায়।

মোহাম্মদ আলী ঝিলন, গাজীপুর

Location :

Gazipur
উচ্চ খরা সহনশীল সয়াবিনের ইনব্রিড জাত ‘জিএইউ সয়াবিন ৬’
উচ্চ খরা সহনশীল সয়াবিনের ইনব্রিড জাত ‘জিএইউ সয়াবিন ৬’ |নয়া দিগন্ত

গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (গাকৃবি) দেশে প্রথমবারের মতো উচ্চ খরা সহনশীল সয়াবিনের ইনব্রিড জাত ‘জিএইউ সয়াবিন ৬’ উদ্ভাবিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের প্রখ্যাত কৃষিতত্ত্ববিদ প্রফেসর ড. এম এ মান্নানের নেতৃত্বে সম্প্রতি এ জাত উদ্ভাবিত হয়। তার দীর্ঘ এক দশকের গবেষণায় এ জাতের উদ্ভাবনের মাধ্যমে গাকৃবির মোট উদ্ভাবিত ফসলের জাতের সংখ্যা ৯৪টিতে পৌঁছাল, যা বাংলাদেশের কৃষিতে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করল।

তাইওয়ানের এশিয়ান ভেজিটেবল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সংগৃহীত প্রায় ২৫০টি জার্মপ্লাজমের তিন বছরের কঠোর পরীক্ষায় ‘জি০০০৫৬’ জার্মপ্লাজমটি খরা সহনশীল হিসেবে নির্বাচিত হয়। পরে ‘সলিডারিডেট নেটওয়ার্ক এশিয়া’র সহায়তায় নোয়াখালি, লক্ষীপুর ও ভোলায় পাঁচ বছরের মাঠ পর্যায়ের সফল মূল্যায়নের ভিত্তিতে জাতীয় বীজ বোর্ড ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর এ জাতটির আনুষ্ঠানিক ছাড়পত্র প্রদান করে। ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ফিল্ড ক্যাপাসিটির মতো কঠিন খরা পরিবেশেও টিকে থেকে উচ্চ ফলন দেয়ার বিরল সক্ষমতা এ জাতটি কৃষির ভবিষ্যতের একটি ব্যতিক্রমী সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

উপকূলীয় চরাঞ্চলে সয়াবিন চাষের যেসব সীমাবদ্ধতা রয়েছে, এ জাত তা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম বিধায় কৃষি বিপ্লবে এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। প্রতি গাছে ৮০ থেকে ১০০টি ফল এবং বড় দানার কারণে এক হাজার বীজের ওজন প্রায় ২৩০ গ্রাম। সাধারণ জাতের তুলনায় এটি বেশি ফলন দিতে সক্ষমতা রাখায় হেক্টর প্রতি অনায়াসেই ৩ দশমিক ২ থেকে ৩ দশমিক ৮ টন ফলন পাওয়া যায়।

জাতটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বীজে ট্রিপসিনের মাত্রা কম থাকায় পোল্ট্রি খাদ্যে প্রোটিন শোষণের হার বাড়ে, ফলে এটি পোল্ট্রি শিল্পের জন্য আশির্বাদস্বরূপ। আবার এ জাত তুলনামূলক কম সময়ের মধ্যে পরিপক্ব হয়ে তিন মাস থেকে তিন মাস ১০ দিনেই উৎপাদন পাওয়া যায়, ফলশ্রুতিতে অল্প সময়ে অধিক ফলন পেয়ে কৃষকরা লাভবান হতে পারেন। তাছাড়া সয়াবিন পুষ্টির শক্তিশালী ভাণ্ডার, এতে রয়েছে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ উচ্চমানের প্রোটিন ও ১৮ থেকে ২০ শতাংশ তেল। অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিড, ভিটামিন ও খনিজে সমৃদ্ধ এ ফসল অপুষ্টি দূরীকরণ, হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস এবং দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে অনন্য ভূমিকা রাখে।

সার্বিক বিষয়ে ড. মান্নান বলেন, ‘জিএইউ সয়াবিন ৬’ জাতটি আমাদের দীর্ঘ নিরলস গবেষণা, মাঠের রোদ-বৃষ্টি আর কৃষকের স্বপ্নের সম্মিলিত ফসল। উপকূলীয় চরাঞ্চলের লবণাক্ততা, অনাবৃষ্টি ও অনিশ্চিত আবহাওয়ার যে কঠিন বাস্তবতা এই জাত সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বেশ ফলপ্রসূ। খরা-প্রবণ জমিতে সয়াবিন চাষ এতদিন অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এ জাত সেই অনিশ্চয়তা ভেঙে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে।’

এ বিষয়ে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. জি কে এম মোস্তাফিজুর রহমান এ সাফল্যে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘জিএইউ সয়াবিন ৬’ বাংলাদেশের কৃষিতে একটি যুগান্তকারী অর্জন। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালীকরণ এবং কৃষকের জীবনে স্থিতিশীলতা আনয়নে এটি টেকসই কৃষির প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।’

তিনি গবেষক দল, ল্যাব ও মাঠপর্যায়ের বিজ্ঞানীদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।

উল্লেখ্য, এর আগে এ গবেষণা দলের লবণ ও জলাবদ্ধতা সহনশীল বৈশিষ্ট্যসহ আরো পাঁচটি উচ্চফলনশীল সয়াবিন জাতের উদ্ভাবনী সাফল্য রয়েছে।