বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স) ১৫ বছর পেরিয়ে ১৬ বছরে পদার্পণ করল। ২০১০ সালের ২২ ডিসেম্বর ‘বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় বিল’ পাসের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে বুটেক্স।
বুটেক্সের ইতিহাস :
বুটেক্সের ইতিহাস অনেক পুরনো। বুটেক্সের গোড়াপত্তন হয় ১৯২১ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে ঢাকার নারিন্দায় ‘ব্রিটিশ স্কুল অব উইভিং’ নামে। পরে দুই ধাপে নাম পরিবর্তন করে ১৯৩৫ সালে ‘পূর্ব বাংলা টেক্সটাইল ইন্সটিটিউট’ এবং ১৯৫০ সালে ‘পূর্ব পাকিস্তান টেক্সটাইল ইন্সটিটিউট’ নাম রাখা হয়।
১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠানটি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে স্থানান্তরিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৮ সালে এটি ‘বস্ত্রকৌশল ও প্রযুক্তি মহাবিদ্যালয়’ নামে চার বছরের বিএসসি কোর্স চালু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কারিকুলাম দেয়।
অবশেষে ২০১০ সালের ৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি কর্তৃক স্বাক্ষরিত ‘বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় বিল’ পাস হয়ে ২২ ডিসেম্বর ২০১০ থেকে প্রতিষ্ঠানটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে। ২০১১ সালের ১৫ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে বুটেক্স উদ্বোধন করা হয়।
বিগত ১৫ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতি :
বুটেক্সের অ্যাকাডেমিক ও পরিকাঠামোগত উন্নয়ন দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচটি অনুষদের অধীনে ১১টি বিভাগে (যেমন- ফেব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং, ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং, অ্যাপারেল ইঞ্জিনিয়ারিং, টেক্সটাইল ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি) বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি প্রদান করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় চার হাজার। ক্যাম্পাসের আয়তন প্রায় ১১ দশমিক ৬৭ একর। ক্যাম্পাসে রয়েছে ১৫ তলাবিশিষ্ট অ্যাকাডেমিক ভবনসহ আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, ১৫টি কর্মশালা ও উন্নত মানের গবেষণাগার।
সরকারি-বেসরকারি গবেষণা প্রকল্পের বরাদ্দও বৃদ্ধি পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ- দু’জন শিক্ষক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ২২ লাখ টাকা অনুদান পেয়েছেন পরিবেশগত বিষয়ে গবেষণার জন্য।
শিক্ষার্থীদের অনুভূতি :
বুটেক্সের টেক্সটাইল ফ্যাশন অ্যান্ড ডিজাইন বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আ ন ম মাহফুজ রাইহান ওহি বলেন, ‘বুটেক্স শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, এটি স্বপ্ন গড়ার এক নির্ভরতার ঠিকানা। ১৫ বছর পেরিয়ে ১৬ বছরে পদার্পণ করায় একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি গর্বিত। এই ক্যাম্পাস আমাকে শৃঙ্খলা, পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসের শিক্ষা দিয়েছে, যা ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করেছে। শিক্ষকদের নিষ্ঠা ও সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বুটেক্স আজ দেশের টেক্সটাইল শিক্ষায় শীর্ষস্থানে। আগামী দিনে গবেষণা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বুটেক্স আরো এগিয়ে যাবে, এটাই আমার প্রত্যাশা।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জনসমূহ :
বুটেক্সের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পুরস্কার ও স্বীকৃতি অর্জন করছে। উদাহরণস্বরূপ- ২০২২ সালে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় কর্তৃক ‘বিশেষ অবদানের জন্য পুরস্কার’ প্রদান করা হয় বুটেক্সকে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বুটেক্সের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দীন শায়ক তার উদ্ভাবনী ‘ডিকার্বনাইজেশন ল্যাব’ ধারণার জন্য ‘গ্লোবাল চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ড-২০২৫’ অর্জন করেছেন।
শিক্ষার্থীদের জন্যও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা এসেছে। এ ছাড়াও শিক্ষকরা সরকারি উদ্যোগে গবেষণা বরাদ্দ পেয়েছেন এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করছেন, যা বুটেক্সের গবেষণা ক্ষেত্রে অগ্রগতি নির্দেশ করে।
দীর্ঘ অপেক্ষা পর প্রথম সমাবর্তন :
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে বুটেক্সের ইতিহাসে যুক্ত হতে যাচ্ছে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। চলতি মাসের ২৭ তারিখ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বুটেক্সের প্রথম সমাবর্তন। প্রতিষ্ঠার ১৫ বছর পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি যখন ১৬ বছরে পদার্পণ করছে, ঠিক সেই সময়েই এই আয়োজনকে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও প্রাক্তনদের জন্য এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কর্মসংস্থানে সাফল্য :
বুটেক্সের স্নাতকরা দীর্ঘমেয়াদে নানা ক্ষেত্রে কর্মরত রয়েছেন। সরাসরি টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস শিল্প (যেমন- স্পিনিং, নিটিং, ডাইং, প্রিন্টিং, ফিনিশিং, ওয়াশিং ইত্যাদি) বিভাগে বিপুল পরিসরে নিয়োগযোগ্যতা আছে, তেমনি প্রাতিষ্ঠানিক কাজে (ইঞ্জিনিয়রিং, ম্যানেজমেন্ট) তাদের চাহিদা রয়েছে। ফলে বুটেক্সের শতভাগ গ্র্যাজুয়েটই পাসের সাথে সাথে চাকরি পেয়ে থাকে।
এমনকি অনেকে মাসে ২৫-৩০ হাজার টাকা থেকে ৫০-৬০ হাজার টাকা বেতন পান। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ব্যাংক, অর্থ-প্রশাসন ও প্রযুক্তি খাতেও বুটেক্সের স্নাতকদের চাহিদা আছে। প্রতিবছর বুটেক্সের অনেক শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাত্রা করছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও লক্ষ্য :
বুটেক্স প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়কে আরো আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক করার লক্ষ্যে কয়েকটি বড় প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। সম্প্রতি এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অর্থায়নে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ১৩ তলাবিশিষ্ট শিক্ষা-গবেষণা ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন। ভবনটিতে কেন্দ্রীয় ল্যাবরেটরি, বিনোদন কেন্দ্রসহ নতুন শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করা হবে।
এর আগে, ২০১৮ সালে চালু করা হয়েছিল পিজিডি প্রোগ্রাম এবং ২০২৪ সালে শুরু হয়েছে ‘স্কিলস ফর ইন্ডাস্ট্রি কম্পিটিটিভনেস অ্যান্ড ইনোভেশন’ কর্মসূচি, যা দক্ষতা উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।
পাশাপাশি ভিসি অধ্যাপক ড. মো: জুলহাস উদ্দিন ভবিষ্যতে আরো গবেষণাভিত্তিক অনুষদ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির কাজ করার পরিকল্পনা ব্যক্ত করেছেন।
বিগত ১৫ বছরে অর্জিত অগ্রগতিকে ভিত্তি করে বুটেক্স সামনে দেশে বস্ত্রশিল্প ও উচ্চশিক্ষায় নেতৃত্ব দেয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে।



