ইবিতে নেই অনলাইন পেমেন্ট সুবিধা, চালুর আশ্বাস মিললেও অগ্রগতি কতদূর!

ফি পরিশোধে দেশের অধিকাংশ সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন সিস্টেম চালু থাকলেও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) এখনো চলছে পুরোনো ব্যাংকনির্ভর পদ্ধতি। ফলে ভর্তি, সেমিস্টার ফি, পরীক্ষা ফি ও সনদ উত্তোলনসহ বিভিন্ন কাজে ফি জমা দিতে ব্যাংকে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোগান্তি পোহাতে হয় শিক্ষার্থীদের।

Location :

Kushtia
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি)
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) |নয়া দিগন্ত

নাজমুস সাকিব, ইবি প্রতিনিধি

ফি পরিশোধে দেশের অধিকাংশ সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন সিস্টেম চালু থাকলেও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) এখনো চলছে পুরোনো ব্যাংকনির্ভর পদ্ধতি। ফলে ভর্তি, সেমিস্টার ফি, পরীক্ষা ফি ও সনদ উত্তোলনসহ বিভিন্ন কাজে ফি জমা দিতে ব্যাংকে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোগান্তি পোহাতে হয় শিক্ষার্থীদের।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম চালুর আশ্বাস মিললেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ ও হতাশা।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম চালুর জন্য একাধিকবার উদ্যোগ নেয়া হলেও তা এখনো পুরোপুরি কার্যকর করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। এর আগে ২০২৩ সালের ২২ নভেম্বর তৎকালীন প্রশাসন ও অগ্রণী ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে একটি ই-পেমেন্ট অ্যাপ চালু করা হয়। তবে কারিগরি সীমাবদ্ধতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং শিক্ষার্থীদের কম আগ্রহের কারণ দেখিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই সেটি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

পরে গত বছরের অক্টোবরে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের দাবির মুখে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির সঙ্গে অনলাইন ফি পরিশোধ ব্যবস্থা চালুর জন্য চুক্তি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সে সময় দ্রুত এ সেবা চালুর সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে প্রশাসনে পরিবর্তন আসায় এর বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সাথে ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন সময় সমন্বয়হীনতা ও প্রশাসনিক জটিলতার অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া ফি ব্যবস্থাপনায় নানা অসঙ্গতি নিয়েও সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক শাখায় তথ্য সংরক্ষণে গাফিলতির কারণে ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার পরও অনেক শিক্ষার্থীর নামে বকেয়া দেখানো হচ্ছে। এতে সনদ, ট্রান্সক্রিপ্টসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।

এ ছাড়া রসিদ দেখাতে না পারলে পুনরায় ফি পরিশোধ করতে বাধ্য করার অভিযোগও রয়েছে। ফলে এসব জটিলতা এড়াতে অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেমকেই অধিক কার্যকর সমাধান হিসেবে দেখছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা।

ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ২০২৩-২৪ বর্ষের শিক্ষার্থী শ্রাবণ হাসান বলেন, "যেখানে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অনলাইনেই সব ফি পরিশোধ করতে পারছেন, সেখানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে কষ্ট করে ব্যাংকে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। অনেক সময় দিনের একটি বড় অংশ শুধু টাকা জমা দেওয়ার পেছনেই চলে যায়।

আবার দুই দিন পরেই নতুন শিক্ষাবর্ষের ভর্তি শুরু। এ সময়টায় যে কী পরিমাণ ভিড় হয়, তা বলে বোঝানো যাবে না। টাকা জমা দেওয়াটাই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। আমার মনে হয়, প্রশাসন এগুলো অনলাইন সিস্টেমে আনতে পারলে আমরা শিক্ষার্থীরাও অনেক উপকৃত হব এবং প্রশাসনের প্রতি আমাদের আস্থাও বাড়বে।"

পরিসংখ্যান ও উপাত্ত বিজ্ঞান বিভাগের ২০১৮-১৯ বর্ষের শিক্ষার্থী ইমামুল হাসান বলেন, "চার বছরে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করা যত না কষ্ট, তার চেয়ে বেশি কষ্ট সার্টিফিকেট তোলা। হল ফি, পরীক্ষা ফি, সেশন ফি, পরিবহন ফি—কোনো একটি বাদ গেলে অ্যাডমিট আসে না, প্রশাসন থেকে পরীক্ষার খাতা দেয়া হয় না। সার্টিফিকেট তুলতে গিয়ে দেখি আমার তিন সেমিস্টারের পরীক্ষা ফি খাতায় তোলেনি, বকেয়া দেখাচ্ছে। ইবির সব সিস্টেম অনলাইন হলে এসব সমস্যা অনেক দ্রুত সমাধান হতো। শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক হয়রানি থেকেও মুক্তি পেত।"

এদিকে আগামী রবিবার (২৮ জুন) থেকে শুরু হতে যাচ্ছে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের চূড়ান্ত ভর্তি কার্যক্রম। তাই ভর্তি প্রক্রিয়ায় ব্যাংকনির্ভর ব্যবস্থার কারণে দীর্ঘসূত্রতা ও ভোগান্তির শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী ও তাঁদের অভিভাবকেরা।

২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী মোহাম্মদ জিহাদ বলেন, "দেশের প্রথম সারির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থা না থাকাটা অত্যন্ত দুঃখজনক। এদিকে ঢাবি, রাবি, জাবি-সহ প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই অনলাইন সিস্টেম চালু রয়েছে। যতটুকু বুঝতে পারছি, ভর্তি হতে গেলে পর্যাপ্ত সময় হাতে নিয়েই যেতে হবে। বড় ভাইদের কাছ থেকে শুনছি, একদিন ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে পরের দিন ভর্তি-সংক্রান্ত অন্যান্য কাজ করলে চাপ কম হবে। ভর্তির সময় ব্যাংকে নাকি অনেক ভিড় থাকে।"

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেলের পরিচালক ড. শাহজাহান আলী বলেন, "অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম চালুর জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়াই প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। অনলাইন পেমেন্ট সুবিধার উদ্যোগকে কার্যকর করতে ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়েছে। কিছুদিন আগে একটি বিভাগে পরীক্ষামূলকভাবে অনলাইনে ফরম পূরণের কার্যক্রমও সফলভাবে পরিচালিত হয়েছে। এখন অন্যান্য বিভাগগুলো থেকে শিক্ষার্থীদের হল-সংযুক্তি ও প্রযোজ্য ফি-সহ যাবতীয় তথ্য নির্ভুলভাবে সংগ্রহ করে ইসলামী ব্যাংকের সিস্টেমে আপলোড করা হলে শিক্ষার্থীরা অনলাইনেই ফি পরিশোধ করতে পারবে। যদিও এটি কিছুটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার, তবে বিভাগগুলোর পক্ষ থেকে সময়মতো তথ্য প্রদান করা হলে অনলাইন পেমেন্ট সুবিধা চালু করতে আর কোনো বাধা থাকবে না।"

নতুন শিক্ষাবর্ষের ভর্তি কার্যক্রমে অনলাইন পেমেন্ট সুবিধা থাকবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, "যেহেতু এটি সময়সাপেক্ষ বিষয়, তাই এখন নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।"

ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা ও বিশ্ববিদ্যালয়স্থ শেখপাড়া সাব-ব্রাঞ্চের ইনচার্জ মোহাম্মদ রবিউল বলেন, "গত বছরের শেষের দিকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অনলাইন ফি পরিশোধসংক্রান্ত চুক্তি সম্পন্ন হয়। এর আওতায় ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষ প্রথম সেমিস্টারের ফি অনলাইনে সফলভাবে আদায় করা হয়েছে। এখন অন্যান্য বিভাগগুলোর তথ্য পেলে দ্রুত সব বিভাগে অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম চালু করা সম্ভব হবে।"

তিনি আরো বলেন, "নতুন উপাচার্য দায়িত্ব গ্রহণের পর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এখনো এ বিষয়ে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে কোনো ইঙ্গিত বা পূর্ণাঙ্গ তথ্য পেলে যত দ্রুত সম্ভব আমরা কাজটি সম্পন্ন করব।"

এদিকে অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম চালুর অগ্রগতি বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. একেএম মতিনুর রহমানের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।