ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বাস্তবতায় ইরানি চিন্তাবিদ ও দার্শনিক আলী শরিয়তীর চিন্তা, দর্শন ও রাজনৈতিক ভাবনার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই অনুষ্ঠানে আলী শরিয়তী চর্চাকেন্দ্রের ম্যাগাজিনের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
শুক্রবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘২৪-পরবর্তী বাংলাদেশে আলী শরিয়তীর প্রাসঙ্গিকতা’ শীর্ষক এ আলোচনা সভা ও ম্যাগাজিনের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান হয়। এতে স্বাগত বক্তব্য দেন আলী শরিয়তী চর্চাকেন্দ্রের পরিচালক মাহফুজ এলাহি।
আলোচনায় অংশ নেন লেখক ও গবেষক ফাহমিদ-উর-রহমান, লেখক ও গবেষক মনোয়ার শামসী শাখাওয়াত, লেখক-গবেষক ও অনুবাদক মুহাম্মাদ তানিম নওশাদ, গণবিপ্লবী উদ্যোগের উদ্যোক্তা আরিফ সোহেল এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বিশ্লেষক ও কলামিস্ট আরিফ ইকবাল খান। এ ছাড়া পাঠক অনুভূতি প্রকাশ করেন ফাহিম আল মাহফুজ।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ও নতুন রাষ্ট্রচিন্তার সন্ধিক্ষণে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আলোকে আলী শরিয়তীর চিন্তাকে নতুন করে পাঠ ও পর্যালোচনা করা জরুরি। বিশেষ করে তাওহিদ, ইনসাফ ও ইনকিলাব—এই তিন ধারণার আলোকে সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানুষের মুক্তির প্রশ্ন পুনর্বিবেচনার একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্র তৈরি করা এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
গণবিপ্লবী উদ্যোগের উদ্যোক্তা আরিফ সোহেল বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মূল ঐক্যবদ্ধকারী শক্তি ছিল তাওহিদ। আলী শরিয়তীও তাঁর সময়ের ছাত্র-জনতার মধ্যে এই ঐক্যবদ্ধকারী শক্তিকে সর্বাগ্রে স্থান দিয়েছিলেন। তাঁর তাওহিদের ধারণার অন্যতম দিক ছিল জালিমের বিরুদ্ধে মজলুম শ্রেণির ঐক্য।
মনোয়ার শামসী শাখাওয়াত বলেন, বাংলাদেশে ইসলামকে দুইভাবে উপস্থাপন করা যেতে পারে—‘কালো ইসলাম’ ও ‘লাল ইসলাম’। তার ভাষায়, যে ইসলাম জুলুমের পক্ষ নেয় এবং নিপীড়ন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে নীরব থাকে, সেটি ‘কালো ইসলাম’। অন্যদিকে যে ইসলাম মজলুমের পক্ষে কথা বলে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, সেটিই ‘লাল ইসলাম’। আলী শরিয়তীর ‘লাল শিয়া’ ও ‘কালো শিয়া’ ধারণা থেকেই এ ভাবনার সূত্র পাওয়া যায় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বিশ্লেষক ও কলামিস্ট আরিফ ইকবাল খান বলেন, বাংলার মানুষ আলী শরিয়তীকে এখনো ব্যাপকভাবে না চিনলেও বাংলাদেশের বিপ্লবী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর চিন্তার সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত ছিলেন এবং সেই চিন্তার আলোকে কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন।
মুহাম্মাদ তানিম নওশাদ বলেন, সূরা নিসায় জুলুমের বিরুদ্ধে আল্লাহর আইনের কঠোরতার যে বার্তা রয়েছে, আলী শরিয়তী তার সময় ও যুগের বাস্তবতার আলোকে সেটিকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন।
ফাহমিদ-উর-রহমান বলেন, আবু জর গিফারি (রা.) সম্পদের সুষম বণ্টনের অন্যতম প্রবক্তা ছিলেন। তার চিন্তার ওপর ভিত্তি করে আলী শরিয়তী সমকালীন বাস্তবতায় নিজের চিন্তা উপস্থাপন করেছিলেন। শরিয়তী ও আবু জর গিফারির চিন্তার মধ্যে মানুষের শ্রেণিবৈষম্য ও বৈষম্যের অবসানের আকাঙ্ক্ষার একটি যোগসূত্র ছিল। তিনি আলী শরিয়তীকে ‘রাজনৈতিক রূহানিয়াতের অগ্রনায়ক’ হিসেবেও উল্লেখ করেন।
পাঠক অনুভূতি প্রকাশ করে ফাহিম আল মাহফুজ বলেন, ইসলামি সভ্যতা নির্মাণে অনেক ত্যাগ ও শ্রমের প্রয়োজন। পিরামিড নির্মাণে শ্রমিকদের যেভাবে হাজারো পাথর বহন করতে হয়েছিল, ইসলামী সভ্যতা নির্মাণেও তেমনি দীর্ঘ পরিশ্রম ও আত্মত্যাগ প্রয়োজন।
আয়োজকরা জানান, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় আলী শরিয়তীর চিন্তা নতুন করে পাঠের প্রয়োজন রয়েছে। তার চিন্তার আলোকে ন্যায়, ইনসাফ, মানবমুক্তি, রাষ্ট্র ও সমাজের কাঠামো এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রশ্নে আরো গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা গড়ে তোলাই এ আয়োজনের লক্ষ্য।



