ঢাবির ফার্মেসি অনুষদে ইমেরিটাস অধ্যাপক সুপারিশে অনিয়মের অভিযোগ

ঢাবির ফার্মেসি অনুষদের সাবেক অধ্যাপক ড. আবদুর রশীদকে অবসরের আগেই ইমেরিটাস অধ্যাপক করার সুপারিশ ও গবেষণা প্রকাশনায় অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে শিক্ষক মহলে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা চলছে।

হারুন ইসলাম
সংগৃহীত

ঢাকা ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডিন, ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান এবং সদ্য অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো: আবদুর রশীদকে ঘিরে শিক্ষক মহলে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, অবসরের আগেই তাকে ইমেরিটাস অধ্যাপক করার সুপারিশের জন্য অ্যাকাডেমিক কমিটির সভার অ্যাজেন্ডাভুক্ত করা হয়। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে পুরোনো কিছু অনিয়মের অভিযোগও সামনে এসেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী, সাধারণত অবসরপ্রাপ্ত স্বনামধন্য অধ্যাপকদের ইমেরিটাস অধ্যাপক পদ দেয়া হয়। শিক্ষা ও গবেষণায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেয়া হয়ে থাকে এই সম্মাননা। অ্যাকাডেমিক কমিটি বা ডিন কমিটির সুপারিশ ও সিন্ডিকেটের অনুমোদনের মাধ্যমে এই পদ দেয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণত ৬৫ বছর বয়সে অবসরের পর বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অধ্যাপক ড. মো: আবদুর রশীদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগের সিলেকশন গ্রেড অধ্যাপক ছিলেন। তিনি গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর অবসরে যান। ৩১ ডিসেম্বর অবসরে গেলেও তার প্রায় তিন মাস আগে থেকেই তাকে ইমেরিটাস অধ্যাপক করার জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে তাকে ইমেরিটাস অধ্যাপকের বানানোর জন্য সেপ্টেম্বরেই অ্যাকাডেমিক সভার অ্যাজেন্ডাভুক্ত করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। সে সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষক পদে বহাল ছিলেন। শিক্ষক মহলের একাংশ বলছে, এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়মের সাথে সাংঘর্ষিক।

জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর সোমবার বেলা ১১টায় বিভাগের অ্যাকাডেমিক কমিটির ২২৪তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২ সেপ্টেম্বর ফার্মেসি অনুষদের ডিনস কমিটির ১০৪তম সভায় ওই অ্যাকাডেমিক কমিটির সুপারিশ পাঠানো হয়। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির কাছে অ্যাকাডেমিক কমিটি ও অনুষদ মিটিংয়ের সুপারিশও পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে বিভাগের কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, আবদুর রশীদের আবেদন নিয়ে আলোচনার সময় সবার মতামত নেয়া হয়নি। যদিও সুপারিশে ‘সর্বসম্মতিক্রমে’ সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, বাস্তবে অনেক শিক্ষক এতে সম্মতি দেননি বলে দাবি তাদের।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. শায়লা কবির বলেন, ‘আমি এ ব্যাপারে কিছু বলতে চাচ্ছি না। আপনি ফার্মেসি অনুষদের ডিন ড. সেলিম রেজা স্যারের সাথে যোগাযোগ করুন। বিভাগের বিষয়গুলো আমরা দেখি। কিন্তু উনার ইমেরিটাস অধ্যাপক হওয়ার সব কার্যক্রম ডিন স্যারের অধীনেই হয়েছে। উনি ভালো বলতে পারবেন।’

বিশ্ববিদ্যালয়ে অবসরপ্রাপ্ত স্বনামধন্য শিক্ষকদের শিক্ষা ও গবেষণায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ইমেরিটাস অধ্যাপক পদ দেয়া হয়। অবসরের পরও তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত থাকতে পারেন।

এদিকে অধ্যাপক আবদুর রশীদের গবেষণা প্রকাশনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন শিক্ষক। জানা গেছে, তার প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধের সংখ্যা প্রায় ৬০০। এর মধ্যে প্রায় ৪০০টি স্থানীয় বাংলাদেশী জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশ ফার্মাসিউটিক্যাল জার্নালে তার ১৫০টির বেশি এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটি জার্নাল অব ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেসে ৯০টির বেশি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া আরো বিভিন্ন স্থানীয় জার্নালে তার দেড় শতাধিক প্রবন্ধ রয়েছে।

শিক্ষকদের একটি অংশের দাবি, বাংলাদেশ ফার্মাসিউটিক্যাল জার্নাল (বিপিজে) এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটি জার্নাল অব ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেস (ডিইউজেপিএস)- এই দু’টি জার্নালের সম্পাদক ছিলেন ড. রশীদ নিজেই। অভিযোগ রয়েছে, নিজের সম্পাদিত জার্নালে নিজের গবেষণা প্রকাশ করে সেগুলোকে গবেষণা ও প্রকাশনার তালিকায় যুক্ত করেছেন তিনি। শিক্ষক মহলের একাংশ এটিকে অ্যাকাডেমিক অসততা হিসেবে দেখছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনুষদের কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলের প্রভাব ব্যবহার করে ইমেরিটাস পদ পাওয়ার চেষ্টা করছেন অধ্যাপক আবদুর রশীদ। তারা বলছেন, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতির সাদা দলের সদস্য এবং ইউট্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডিন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রো-ভিসি (শিক্ষা) ড. সীতেশ চন্দ্র বাছারের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বলেও জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি বৈধ দাবি ও অন্যায়ের প্রতিবাদে বিগত রেজিমে আওয়ামী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামের সামনের সারিতে ছিলাম। দীর্ঘ সময় ত্যাগ তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে গেছি। আমাকে মিথ্যা দোষারোপ করা হচ্ছে। আসলে আমার ভালো অনেকের চোখে সহ্য হয় না।

এদিকে তার বিরুদ্ধে পুরোনো কিছু অভিযোগও নতুন করে সামনে এসেছে। গুঞ্জন রয়েছে, বিভাগীয় চেয়ারম্যান থাকাকালে ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট আকতারুজ্জামানকে নিয়োগ দেয়ার সময় তিনি নিয়মবহির্ভূতভাবে তিনজন সদস্যকে ভাইভা বোর্ডে রেখেছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়াই ওই সদস্যদের বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এছাড়া নিয়োগ বোর্ডের কাগজপত্রে ওই তিনজনের স্বাক্ষরও ছিল না। পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দেয়ার উদ্দেশ্যেই তাদের রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। অনুমোদনহীন সদস্যদের নাম সহ সমস্ত ডকুমেন্ট নষ্ট করে ফেলে বলে জানান উক্ত কমিটির একজন বৈধ সদস্য।

এ বিষয়ে ড. আবদুর রশীদ বলেন, এ অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই। তুমি চাইলে ওই সময়কার বোর্ডের সুপারিশ তালিকা চেক করে দেখতে পারেন। যদি এমন হত আওয়ামী রেজিমে আমাকে ছাড় দেয়া হতো না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একই বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও বিজ্ঞানী ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রফেসর ইমেরিটাস’ হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর থেকেই আবদুর রশীদের আবেদন নিয়ে আলোচনা আরো জোরাল হয়।

এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, অবসরের কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও অধ্যাপক আবদুর রশীদ এখনো বিভাগের নিজ কক্ষ ব্যবহার করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, অবসরের পর শিক্ষকদের অফিস কক্ষ ছেড়ে দিতে হয়। পরে নতুন শিক্ষকদের জন্য কক্ষ বরাদ্দ দেয়া হয়। তবে বিশেষ পদ বা ইমেরিটাস মর্যাদা থাকলে ভিন্ন নিয়ম প্রযোজ্য হতে পারে। কিন্তু এখনো ইমেরিটাস অধ্যাপক না হওয়া সত্ত্বেও তিনি বিভাগের কক্ষ ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে ফার্মেসি অনুষদের ডিন ড. সেলিম রেজার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি পরে ফোন করার কথা বলেন। তবে পরে তিনি আর যোগাযোগ করেননি।

ড. আবদুর রশীদ বলেন, ‘আমার জানা মতে, জানুয়ারিতে আমাকে ইমেরিটাস অধ্যাপক করার বিষয়টি অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের অ্যাজেন্ডাভুক্ত হয়েছে। আমি গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর অবসর নিয়েছি। সে হিসেবে জানুয়ারিতে আমি পুরোপুরি অবসরপ্রাপ্ত ছিলাম। তবে এলপিআরে থাকায় দীর্ঘদিন ধরেই বিভাগের মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করি না। ৩১ ডিসেম্বরের আগে অ্যাকাডেমিক কমিটি বা ডিন কমিটি থেকে কোনো সুপারিশ করা হয়ে থাকলে, সেটি আমার জানা নেই। এটি তো দীর্ঘ একটি প্রক্রিয়া। তাই বিভাগ থেকে হয়তো আগেই কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল। এ বিষয়ে আমার কোনো জানা নেই। তবে অনেকেই হয়তো হিংসাত্মকভাবে আমাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পায়তারা করছে।’