দেশের মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা স্তর পর্যন্ত ‘মেধা’ ও ‘সাধারণ’ বৃত্তি এবং আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধির বড় পরিকল্পনা নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। জুনিয়র শিক্ষাবৃত্তি বাড়ানোর উদ্যোগের পর এবার এসএসসি, এইচএসসি এবং স্নাতক পর্যায়ের সব ধরনের বৃত্তির হার ২০ শতাংশ এবং বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের মাসিক ও এককালীন অর্থের পরিমাণ বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) সম্প্রতি এ সমন্বিত প্রস্তাবটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। প্রস্তাবনাটি কার্যকর হলে বর্তমানে বিদ্যমান ৪১ হাজার বৃত্তির সাথে আরো নতুন করে যুক্ত হবে আট হাজার ১৯২ জন শিক্ষার্থী। প্রস্তাবিত সংখ্যা বাড়লে এ তিন স্তরের বৃত্তির সংখ্যা দাঁড়াবে মোট ৪৯ হাজার ১৫১ জনে।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক বি এম আব্দুল হান্নান বলেন, ‘জুনিয়র শিক্ষাবৃত্তির হার ও আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধির সাথে সাথে এসএসসি, এইচএসসি ও স্নাতক পর্যায়ের বৃত্তি না বাড়ালে একটা অসামঞ্জস্য তৈরি হবে। এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই আমরা একটা বড় পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছি।’
তিনি বলেন, ‘উচ্চতর শিক্ষাস্তর পর্যন্ত বৃত্তির সংখ্যা এবং অর্থের পরিমাণ বাড়ানোর প্রস্তাবটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি—শিগগিরই অর্থ বিভাগের অনুমোদন মিলবে এবং চলতি অর্থ বছর থেকে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।’
মাউশি জানিয়েছে, বর্তমানে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে নির্ধারিত হারে শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। তবে গত এক দশকে জীবনযাত্রার ব্যয় এবং শিক্ষা উপকরণ সামগ্রীর দাম কয়েকগুণ বাড়লেও বৃত্তির অর্থের পরিমাণ বাড়েনি। বর্তমান বাজারদরের ঊর্ধ্বগতির কারণে বিদ্যমান বৃত্তির অর্থ শিক্ষার্থীদের মৌলিক চাহিদা পূরণে একেবারেই পর্যাপ্ত নয়। এই বাস্তবতায় দীর্ঘ নয় বছর পর মেধাবীদের পড়ালেখায় উৎসাহিত করতে আর্থিক সুবিধা ও বৃত্তির সংখ্যা উভয়ই বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রস্তাবনায় মাউশি বলেছে, কেবল জুনিয়র শিক্ষাবৃত্তির সংখ্যা ও আর্থিক সুবিধা বাড়ানো হলে তা উচ্চতর স্তরের (এসএসসি, এইচএসসি ও স্নাতক) বৃত্তির হারের চেয়ে বেশি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়।
মাউশির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের সহকারী পরিচালক কামরুন নাহার জানান, প্রতিটি স্তরের শিক্ষায় সামঞ্জস্য বজায় রাখতেই এসএসসি ও এইচএসসি এবং স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতক (পাস)সহ সকল স্তরের রাজস্ব খাতভুক্ত বৃত্তির হার বাড়ানোর এ সমন্বিত প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, আমরা শুধু শিক্ষাবৃত্তির হার নয়, বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের মাসিক ও এককালীন অর্থের পরিমাণ বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ করার কথা বলেছি।
প্রস্তাবনাটির বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের যুগ্মসচিব সাইদুর রহমান বলেন, ‘মাউশি থেকে জুনিয়র বৃত্তি ছাড়াও মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা স্তরের বৃত্তির হার, মাসিক ও এককালীন আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর সমন্বিত একটি প্রস্তাবনা আমাদের কাছে এসেছে। আমরা বর্তমানে প্রস্তাবটি যাচাই-বাছাই করছি। এটি চূড়ান্ত করে অর্থ বরাদ্দের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।’
এসএসসি বৃত্তি :
এসএসসি পর্যায়ে সারা দেশে বর্তমানে বৃত্তি পায় ২৫ হাজার ৫০০ জন শিক্ষার্থী। প্রস্তাবিত খসড়ায় এই সংখ্যা ২০ শতাংশ বাড়িয়ে ৩০ হাজার ৬০০ জনের করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ট্যালেন্টপুল বৃত্তি তিন হাজার ৬০০ এবং সাধারণ বৃত্তি ২৭ হাজার। এসএসসির ট্যালেন্টপুল বৃত্তির মাসিক হার ৬০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার ২০০ টাকা এবং বার্ষিক এককালীন অনুদান ৯০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার ৮০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সাধারণ বৃত্তির হার মাসিক ৩৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০০ টাকা এবং বার্ষিক এককালীন অনুদান ৪৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে এ খাতে সরকারের দুই বছরে ব্যয় ২৫ কোটি ৭৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৬১ কোটি ৮৮ লাখ ৪০ হাজার টাকায় দাঁড়াবে।
এইচএসসি বৃত্তি :
প্রস্তাবনা অনুযায়ী, এইচএসসি পর্যায়ে বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১০ হাজার ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৬০০ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। শতাংশ হিসেবে যা আগের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি। আর এইচএসসি ট্যালেন্টপুল বৃত্তির মাসিক হার ৮২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার ৬৫০ টাকা এবং এককালীন অনুদান এক হাজার ৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে তিন হাজার ৬০০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে।
বিপরীতে, সাধারণ বৃত্তির মাসিক হার ৩৭৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫০ টাকা এবং এককালীন অনুদান ৭৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার ৫০০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। এ খাতে পাঁচ বছরে সরকারের সম্ভাব্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৪ কোটি ৮৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। যা আগের বরাদ্দ ছিল ৩১ কোটি ২৯ লাখ ছয় হাজার ২৫০ টাকা।
মাউশি জানিয়েছে, এইচএসসি বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা মেডিক্যালে অধ্যয়নরত তারা পাঁচ বছর বৃত্তির অর্থ প্রাপ্য হবেন। এক্ষেত্রে প্রাপ্যতা পাঁচ বছর ধরে এইচএসসির বৃত্তির হিসাব করা হয়েছে।
স্নাতক (সম্মান ও পাস) বৃত্তি :
মাউশির প্রস্তাবনা অনযায়ী, স্নাতক সম্মানে বৃত্তির সংখ্যা চার হাজার ৬৫০ থেকে বাড়িয়ে পাঁচ হাজার ৫৮০ এবং স্নাতক পাস কোর্সের জন্য ৩০৯ থেকে বাড়িয়ে ৩৭১ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এক্ষেত্রেও মাসিক ও এককালীন অর্থের পরিমাণ দ্বিগুণ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রস্তাব মতে, স্নাতক স্তরের ট্যালেন্টপুল বৃত্তির মাসিক হার এক হাজার ১২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে দু’ হাজার ২৫০ টাকা এবং এককালীন অনুদান এক হাজার ৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে তিন হাজার ৬০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সাধারণ বৃত্তির মাসিক হার ৪৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯০০ টাকা এবং এককালীন অনুদান ৯০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার ৮০০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে।
এ খাতে এক বছরে সরকারের সম্ভাব্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে সাত কোটি ৩৫ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। আগে বরাদ্দ ছিল তিন কোটি ছয় লাখ ৩৫ হাজার টাকা।
একইভাবে, স্নাতক (পাস) কোর্সের ট্যালেন্টপুল বৃত্তির মাসিক হার এক হাজার ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে দু’ হাজার ১০০ টাকা এবং এককালীন অনুদান এক হাজার ৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে তিন হাজার ৬০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সাধারণ বৃত্তির মাসিক হার ৩৭৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫০ টাকা এবং এককালীন অনুদান ৬০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার ২০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। স্নাতক (পাস) বার্ষিক সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৯ লাখ ৭৭ হাজার ৬০০ টাকা। যা আগে ছিল ৩৩ লাখ ১৯ হাজার ২০০ টাকা। বাসস



