ঢাবি প্রতিনিধি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হলের একটি সমস্যা নিয়ে পোস্ট শেয়ার করাকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফজলুল হক মুসলিম হলের এক শিক্ষার্থীকে প্রায় দেড় ঘণ্টা আটকে রেখে ভয়ভীতি প্রদর্শন, মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়া এবং জোর করে লিখিত বক্তব্যে স্বাক্ষর নেয়ার অভিযোগ উঠেছে হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো. ইলিয়াস আল-মামুনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনার প্রতিবাদে প্রভোস্টের পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা।
রোববার রাত ৮টার দিকে হল প্রাঙ্গণে এ বিক্ষোভ শুরু হয়। এতে হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক মো. ইকবাল হায়দার এবং ফজলুল হক মুসলিম হল সংসদের ভিপি-জিএসসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা অংশ নেন।
বিক্ষোভে শিক্ষার্থীরা অভিযুক্ত প্রভোস্টের পদত্যাগ দাবি করেন। একই সাথে শিক্ষার্থী হেনস্তার অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান তারা। এ সময় তারা বিভিন্ন স্লোগান দেন।
শিক্ষার্থীর অভিযোগ
ঘটনার সূত্রপাত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হলের একটি সমস্যা নিয়ে করা পোস্ট শেয়ার করাকে কেন্দ্র করে। হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবটিক্স অ্যান্ড মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহীমের অভিযোগ, পোস্টটি শেয়ার করার পর তাকে হল প্রভোস্টের কার্যালয়ে ডেকে নেয়া হয়।
ইব্রাহীমের দাবি, নিরাপত্তা ও তথ্যপ্রমাণের জন্য তিনি মোবাইলে অডিও রেকর্ড চালু করে প্রভোস্টের কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। বিষয়টি জানতে পেরে প্রভোস্টের নির্দেশে হলের ইলেকট্রিশিয়ান, প্রধান সহকারীসহ কয়েকজন কর্মচারী তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেন। পরে কার্যালয়ের দরজা বন্ধ করে তাকে প্রায় দেড় ঘণ্টা আটকে রাখা হয়।
তার অভিযোগ, এ সময় হলের সিট ও ছাত্রত্ব বাতিল এবং সাইবার নিরাপত্তা আইনে মামলা দেয়ার ভয় দেখানো হয়। পাশাপাশি তাকে একটি লিখিত বক্তব্য দিতে বাধ্য করা হয় এবং তাতে স্বাক্ষর নেয়া হয়।
ইব্রাহীমের ভাষ্য, ওই লিখিত বক্তব্যে তাকে দিয়ে উল্লেখ করানো হয় যে হল সংসদের প্রতিনিধি বা অন্যদের প্ররোচনায় পড়ে তিনি প্রভোস্টের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টটি শেয়ার করেছেন। ঘটনার আকস্মিকতা ও মানসিক চাপে একপর্যায়ে তিনি কান্নাকাটি শুরু করেন। পরে ভবিষ্যতে এ ধরনের পোস্ট না করার শর্তে ক্ষমা চাইলে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।
ইব্রাহীম বলেন, “হলের একটি সমস্যা নিয়ে একটি পোস্ট শেয়ার দেয়ার পর আমাকে হল অফিসে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে তারা আমার গায়ে হাত তোলেন। আমার মোবাইল ফোনও চেক করেন তারা।”
প্রভোস্টের বক্তব্য
শিক্ষার্থীর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো. ইলিয়াস আল-মামুন। তিনি বলেন, “ওই শিক্ষার্থীকে ডেকে স্বাভাবিকভাবে কথা বললাম। তার অভিভাবকের সাথে কথা বলার পরে তাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নাস্তা করিয়ে বিষয়টির মিটমাট করলাম।”
শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন চেক করার অভিযোগ অস্বীকার করে প্রভোস্ট বলেন, শিক্ষার্থী তার অনুমতি ছাড়া কার্যালয়ে অডিও রেকর্ড করছিলেন। তিনি বলেন, “ওই শিক্ষার্থী রুমে প্রবেশের শুরু থেকেই রেকর্ডিং চালু করে রেখেছিল। বিষয়টি জানতে পেরে তাকে বলি, আমার পারমিশন ছাড়া রেকর্ড কীভাবে করতে পারো? এটা এখনই ডিলেট করো। আমি তার ফোন চেক করিনি। হলের স্টাফদের দিয়ে তাকে দিয়ে ডিলিট করিয়েছি।”
জোর করে শিক্ষার্থীর স্বাক্ষর নেয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি। প্রভোস্টের ভাষ্য, শিক্ষার্থীকে বোঝানোর পর তার বিরুদ্ধে ফান্ড না দেয়ার অভিযোগ কারা করেছে, তাদের নাম লিখতে বলা হয়েছিল এবং শিক্ষার্থী নিজেই নামগুলো লিখেছেন।
শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। শিক্ষার্থীরা বলেন, কোনো আবাসিক শিক্ষার্থী অভিযোগ বা মতামত প্রকাশ করলে তাকে ভয়ভীতি দেখানো বা হেনস্তা করা গ্রহণযোগ্য নয়। তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান।
ডাকসুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক এবং ফজলুল হক মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মো. ইকবাল হায়দার বলেন, হল প্রভোস্টের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের সাথে এ ধরনের আচরণের অভিযোগ এর আগেও ছিল। বর্তমান ঘটনাটিও কোনোভাবেই কাম্য নয়।
তিনি বলেন, “স্বয়ং হল প্রভোস্ট এ ধরনের ঘটনায় জড়িত হলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেবে কে?”
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ও প্রভোস্টের বক্তব্যে ঘটনার বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। শিক্ষার্থী দাবি করছেন, তাকে আটকে রেখে ভয়ভীতি দেখানো ও জোর করে স্বাক্ষর নেয়া হয়েছে। অন্যদিকে প্রভোস্ট এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ঘটনাটি আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসার কথা বলেছেন।
এ অবস্থায় ঘটনার প্রকৃত কারণ ও সত্যতা উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় কোনো তদন্ত কমিটি গঠন বা আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য জানা যায়নি।



