বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (ইএসই) বিভাগটি ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত, যা টেক্সটাইল শিল্পে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও টেকসই উন্নয়নের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে বিশেষায়িত বিএসসি ডিগ্রি দেন। এখানে ৪০টি আসন রয়েছে এবং কোর্সটি ৪ বছর মেয়াদী (৮ সেমিস্টার)।
বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর একটি হলো জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা। শিল্পায়নের দ্রুত অগ্রগতির ফলে পরিবেশের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, তা মোকাবিলায় এখন বিশ্বজুড়েই টেকসই উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি টেক্সটাইল ও বস্ত্রশিল্পের ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করছে পরিবেশবান্ধব ও দায়িত্বশীল উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর। এই প্রেক্ষাপটে উচ্চশিক্ষার একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং দ্রুত শিক্ষার্থীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
সময়ের দাবি ও উচ্চশিক্ষার গুরুত্ব :
বর্তমানে বস্ত্র শিল্পসহ প্রায় সব উৎপাদনমুখী খাতে পরিবেশগত ঝুঁকি হ্রাস, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং টেকসই পদ্ধতি গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। বুটেক্স এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ এই চাহিদাকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের যুগোপযোগী ও দক্ষ করে গড়ে তুলছে। ২০১৮ সালে যাত্রা শুরু করা এই বিভাগে বর্তমানে চারটি ব্যাচ অধ্যয়নরত রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি ব্যাচ ওবিই কারিকুলামের অন্তর্ভুক্ত এবং একটি নন-ওবিই। ইতোমধ্যে তিনটি ব্যাচ সফলভাবে স্নাতক সম্পন্ন করেছে।
বর্তমানে স্নাতক পর্যায়ের পাশাপাশি স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি প্রোগ্রামেও শিক্ষার্থীরা গবেষণায় নিয়োজিত আছেন। বিভাগে ছয়জন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পাঠ্যক্রমে দূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) এবং পরিবেশ আইন ও নীতিমালার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা একদিকে তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি অন্যদিকে শিল্পক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতাও অর্জন করছে।
কর্মক্ষেত্রে বিস্তৃত সম্ভাবনা :
এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের স্নাতকদের কর্মক্ষেত্র বর্তমানে দেশীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিস্তৃত। পরিবেশবান্ধব উৎপাদন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কঠোর শর্তের কারণে দেশের প্রায় প্রতিটি বস্ত্র কারখানায় এখন কমপ্লায়েন্স ও সাসটেইনেবিলিটি-সংক্রান্ত দক্ষ জনবলের চাহিদা তৈরি হয়েছে। ফলে এই বিভাগের শিক্ষার্থীরা কমপ্লায়েন্স অফিসার, সাসটেইনেবিলিটি এক্সিকিউটিভ, ইটিপি অপারেটর এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছে।
এছাড়াও আন্তর্জাতিক অডিট ও সার্টিফিকেশন সংস্থা, বায়িং হাউজ, বহুজাতিক ব্র্যান্ডের প্রতিনিধি অফিস এবং পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাসটেইনেবিলিটি কো-অর্ডিনেটর, এনার্জি অডিটর ও এনভায়রনমেন্টাল কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজের সুযোগ ক্রমেই বাড়ছে। সরকারি ক্ষেত্রেও পরিবেশ অধিদফতর, বিসিক, বেজা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থায় এই বিভাগের গ্র্যাজুয়েটদের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কেনো ইএসই বিভাগ আলাদা :
বুটেক্সের অন্য বিভাগের তুলনায় এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (ইএসই) বিভাগটি একটি স্বতন্ত্র ও সময়োপযোগী অবস্থান তৈরি করেছে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে টেক্সটাইল শিল্প শুধু উৎপাদনকেন্দ্রিক নয়; বরং পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স, কার্বন ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক টেকসই নীতিমালার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত। এই বাস্তবতায় ইএসই বিভাগের পাঠ্যক্রম টেক্সটাইল ও পরিবেশ বিজ্ঞানের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয়েছে।
বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. উম্মুল খায়ের ফাতেমার মতে, ‘আউটকাম বেইজড কারিকুলামের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের এমনভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে, যাতে তারা ইটিপি অপারেশন, বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা, এনার্জি দক্ষতা, লাইফ সাইকেল অ্যাসেসমেন্ট (এলসিএ), কার্বন ও ওয়াটার ফুটপ্রিন্ট এবং ইএসজি রিপোর্টিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে দক্ষ হয়ে উঠতে পারে। সম্প্রতি ‘এমএসসি ইন সাসটেইনেবিলিটি ইন টেক্সটাইলস’ নামে একটি বিশেষায়িত মাস্টার্স প্রোগ্রাম চালুর মাধ্যমে এই বিভাগ উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
বিভাগটির গবেষণা কার্যক্রম, যেমন : ডাইহাউজের দূষিত পানির পুনঃব্যবহার, ক্লিনার প্রোডাকশন এবং নেচার-বেইজড সল্যুশন দেশের টেক্সটাইল শিল্পের বাস্তব সমস্যার সমাধানে সরাসরি ভূমিকা রাখছে। ফলে এই বিভাগের শিক্ষার্থীরা শুধু কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতেই নয়, বরং শিল্পকে আরো প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই করে তুলতেও সক্ষম হচ্ছে।
বর্তমানে জার্মানিতে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী সুস্মিতা পাল বলেন, ‘ইএসই বিভাগের কোর্স কারিকুলাম এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেখানে টেক্সটাইল ও পরিবেশ উভয় বিষয়ের সমন্বয় রয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আধুনিক ল্যাব সুবিধার কারণে শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক দক্ষতাও অর্জন করতে পারে, যা উচ্চশিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চাকরির ক্ষেত্রেও এই বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে বহুমাত্রিক সুযোগ। প্রচলিত মার্চেন্ডাইজিং, মার্কেটিং, সাপ্লাই চেইন ও প্রোডাকশন সেক্টরের পাশাপাশি গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান যেমন Hohenstein Institute, Intertek ও বিভিন্ন কনসালটেন্সি ফার্মে কাজের সুযোগ ক্রমেই বাড়ছে। পাশাপাশি গ্রীন টেকনোলজি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও এই বিভাগের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।’
বিভাগীয় প্রধানের দৃষ্টিভঙ্গি ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ :
বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. উম্মুল খায়ের ফাতেমা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘দেশের বস্ত্র ও শিল্প খাতে দক্ষ পরিবেশ প্রকৌশলীর যে ঘাটতি রয়েছে, তা পূরণে এই বিভাগের শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
তিনি আরো জানান, ইউরোপ, আমেরিকা ও কানাডা বর্তমানে এই বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সম্ভাবনাময় গন্তব্য। ইতোমধ্যে বিভাগের একাধিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ও গবেষণায় নিয়োজিত রয়েছেন।
পাশাপাশি, ২০২৬ সাল থেকে দ্বিতীয় ব্যাচের স্নাতকোত্তর (এমএসসি) ভর্তি কার্যক্রম শুরু হবে, যা গবেষণা ও জ্ঞানচর্চাকে আরো সম্প্রসারিত করবে।
ভবিষ্যতের প্রস্তুতি, শিক্ষার্থীদের জন্য দিকনির্দেশনা :
উচ্চশিক্ষা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে প্রস্তুত করতে শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে—
অ্যাকাডেমিক ফলাফল : শুরু থেকেই ভালো ফলাফল ধরে রাখা জরুরি।
গবেষণা অভিজ্ঞতা : প্রাসঙ্গিক বিষয়ে গবেষণা ভবিষ্যতে বৃত্তির সুযোগ বাড়ায়।
বৈশ্বিক সচেতনতা : বিশ্বমানের গবেষণা ও বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে আপডেট থাকা প্রয়োজন।
ভাষাগত দক্ষতা : আইএলটিএস/জিআরইসহ ইংরেজি দক্ষতা অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব এখন এনভায়রনমেন্টাল সোশ্যাল অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (ইএসজি) ভিত্তিক উন্নয়নের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং শুধু একটি শিক্ষা বিষয় নয়; বরং টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম হাতিয়ার। যথাযথ দক্ষতা ও নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পারলে এই খাত বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্পকে আরো নিরাপদ, প্রতিযোগিতামূলক এবং বিশ্বমুখী করে তুলবে।



