ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
শিক্ষার্থীদের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করা, ক্যাম্পাসের অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা জোরদার, খাদ্য নিরাপত্তা, আবাসন, গবেষণা ও ক্যারিয়ার সুবিধা বাড়ানোসহ ২৯টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) পঞ্চম কার্যনির্বাহী সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিকেল ৫টায় ডাকসুর সভাকক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও ডাকসুর সভাপতি অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদের সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য দেন ভিপি সাদিক কায়েম, এজিএস মহিউদ্দিন খান ও কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এইচ এম মোশারফ হোসেন। ডাকসুর নির্বাচিত সম্পাদকমণ্ডলী ও কার্যনির্বাহী সদস্যরা সভায় উপস্থিত ছিলেন।
সভায় শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং একটি শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ে তোলার লক্ষ্যে এসব সিদ্ধান্ত ও প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়।
সভায় আগামী ১২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পরবর্তী ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার জন্য ভিসির কাছে জোর দাবি জানানো হয়। জবাবে ভিসি জানান, নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে প্রাথমিকভাবে একটি সেল গঠন করা হয়েছে এবং দ্রুত তফসিল ঘোষণা করা হবে।
শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর অগ্রগতি শিক্ষার্থীদের জানাতে প্রশাসনের কাছে দাবি জানায় ডাকসু। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিস্তারিত তথ্য নোটিশের মাধ্যমে প্রকাশ করবে বলে ভিসি আশ্বাস দেন।
এছাড়া শাহবাগ থানায় ডাকসু নেতৃবৃন্দ ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে আগামী সোমবারের মধ্যে সন্তোষজনক অগ্রগতি না হলে শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে কর্মসূচি দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িত ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্যও ভিসির প্রতি আহ্বান জানানো হয়। ভিসি জানান, কয়েকজনের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এবং অন্যদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ডাকসুর আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এইচ এম মোশারফ হোসেনকে প্রধান করে একটি অডিট কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে দ্রুত অভ্যন্তরীণ অডিটের প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টিও সভায় গুরুত্ব পায়। পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথরিটি এবং ডাকসুর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি ফুড সেফটি কমিটি গঠনের প্রস্তাবে ভিসি নীতিগত সম্মতি দেন।
কার্জন হলে ক্যান্টিন চালুর বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে সভায় জানান ভিসি। একইসাথে মোকাররম ভবন ও অ্যানেক্স ভবনে ক্যান্টিন স্থাপনের জন্য জায়গা বরাদ্দের বিষয়ে দ্রুত স্পেস কমিটির সভা আহ্বানের নির্দেশ দেয়া হয়।
নারী শিক্ষার্থীদের হয়রানি কমাতে সংশ্লিষ্ট কমিটি সক্রিয় করার পাশাপাশি নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত জিমনেসিয়াম চলতি মাসে উদ্বোধনের সিদ্ধান্ত হয়। অনাবাসিক নারী শিক্ষার্থীদের হলে প্রবেশাধিকার এবং আন্তঃহল যাতায়াতের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি ডিজিটাল এন্ট্রি-এক্সিট ব্যবস্থা চালুর বিষয়েও দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলা হয়েছে।
ক্যাম্পাসে কার্যকর পুলিশিং ব্যবস্থা চালু, রিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণ, প্রবেশদ্বারে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং ডিজিটাল গেট স্থাপনের ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের সাথে আলোচনা করবেন বলে ভিসি জানান।
সভায় শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ওয়ান ডিইউ অ্যাপ’ তৈরির প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। প্রস্তাবিত অ্যাপে হলের সিট বরাদ্দ, পেমেন্ট ও নিয়মিত কার্যক্রম, বিভাগীয় একাডেমিক প্রোফাইল, কোর্স, শিক্ষক মূল্যায়ন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সেবা ও ই-নথিসহ শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সেবাগুলো যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
‘টিচার হু ইন্সপায়ার্ড মি’ থিমে শিক্ষার্থীদের ভোটের মাধ্যমে ‘বেস্ট টিচার অ্যাওয়ার্ড’ চালুর সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে।
প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সহায়তায় ‘ডিসএবিলিটি সাপোর্ট সেল’ গঠনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হলে ভিসি এতে নীতিগত সম্মতি দেন। একইসাথে ডাকসু সংগ্রহশালার সংস্কার দ্রুত শেষ করে চলতি মাসেই উদ্বোধনের সিদ্ধান্ত হয়।
ডাকসুর জন্য বরাদ্দ পাওয়া দুই কোটি টাকা দিয়ে কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ সংস্কারের জন্যও জোর দাবি জানানো হয়।
উচ্চশিক্ষায় আবেদন করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের হয়রানি কমাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেটে পাসের তারিখ ও সার্টিফিকেট প্রদানের তারিখ আলাদাভাবে উল্লেখ করার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হয়। এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য ভিসির প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
আবাসিক হলগুলোতে সিট বরাদ্দে স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন ও দ্রুত বাস্তবায়নের অগ্রগতি তদারকির সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি হলে আইটি ও ক্যারিয়ার সেন্টার স্থাপন এবং একজন করে অপারেটর নিয়োগের প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়।
শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও গবেষণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ ও রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ চালুর অগ্রগতির বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এছাড়া হলপাড়ায় ফার্মেসি ও সাইকেল গ্যারেজ স্থাপন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ই-লাইব্রেরির সংস্কার, ক্যাম্পাসে পরমাণু শক্তি কমিশনের কার্যক্রম অন্যত্র সরিয়ে নেয়া, উপযুক্ত ভবনের ছাদে হাইব্রিড মডেলের সোলার প্যানেল স্থাপন এবং কলা ও বিজনেস ফ্যাকাল্টির লিফট সংস্কারের বিষয়েও আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় দুই হাজার ৮৪১ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের প্রথম ধাপে আবাসিক হলগুলো বাদ পড়ার বিষয়টি সভায় তুলে ধরে শিক্ষার্থীদের হলগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানায় ডাকসু। ভিসি এতে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন।
এছাড়া শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবীমা-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া, ভিসির সাথে ডাকসু ও হল সংসদগুলোর মতবিনিময় সভা আয়োজন এবং শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক কল্যাণে প্রশাসনিক কার্যক্রম আরো গতিশীল করার বিষয়েও সভায় সিদ্ধান্ত ও আলোচনা হয়।
ডাকসুর নেতারা মনে করেন, এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা গেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক, আবাসিক, নিরাপত্তা, গবেষণা ও ক্যারিয়ার-সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং একটি আরো শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ে তোলার পথ সুগম হবে।



