দীর্ঘ প্রায় ৩৩ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচন। বহুল প্রতীক্ষিত এই নির্বাচন ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয় সরগরম হয়ে উঠেছে। প্রায় সব ছাত্রসংগঠনই প্রার্থী চূড়ান্তকরণ এবং ‘ছায়া প্রচারণায়’ ব্যস্ত সময় পার করছে। তবে ছাত্রদল এগুচ্ছে ভিন্ন কৌশলে। প্রার্থী বাছাইয়ে শিক্ষার্থীদের চাহিদাকেই গুরুত্ব দিচ্ছে ছাত্র সংগঠনটি। দলের দুঃসময়ে পাশে থাকা, আন্দোলন-সংগ্রামে সরব, শিক্ষার্থীদের মধ্যে জনপ্রিয় ক্লিন ইমেজের প্রার্থী বাছাই করে একটি ইনক্লুসিভ প্যানেল দিতে চাইছে সংগঠনটি। এতে করে শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন এবং ভোটের মাঠে চমক দেখাতে পারবেন বলে মনে করছে ছাত্রদল।
শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা জানায়, জাকসুকে সামনে রেখেই গত ৮ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষাথীদের দিয়ে বর্ধিত ও হল কমিটি ঘোষণা করা হয়। এরপরই কমিটিতে পদপ্রাপ্ত অনেককে নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এই বিতর্ক দূর করতে দ্রুতই ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ছাত্রদলের এই সংস্কারকে অভিনন্দন জানিয়েছে অনেকে। বিতর্ক এড়িয়ে এবার জাকসুতে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে জনপ্রিয়, ত্যাগী এবং ক্লিন ইমেজের প্রার্থী মনোনীত করতে চাইছে দলটি।
ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ একটি সূত্র বলছে, ৫ আগস্টের আগে সক্রিয় দলের ত্যাগী নেতাকর্মী ও পরবর্তীকালে ক্যাম্পাসে সংগঠনটির নিয়মিত কার্যক্রমে অংশ নেয়া নেতাকর্মীরাই প্রার্থী মনোনয়নে প্রাধান্য পাবেন। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ শিক্ষার্থীদের মুখে মুখে ছাত্রলদলের শীর্ষ পদগুলোর দৌড়ে কয়েকজন নেতাকর্মীর নাম চর্চিত হচ্ছে। এর মধ্যে জোর আলেচনায় আছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ণ এবং অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের ৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আব্দুল গাফফার জিসান, বাংলা বিভাগের ৪৮তম ব্যাচের শেখ সাদী, ইংরেজী বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী হামিদুল্লাহ সালমান, অর্থনীতি বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের আবু নাইম, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের মেহেদী হাসান ইমন।
জানা গেছে, ৫ আগস্টের আগে শাখা ছাত্রদলের যে কয়েকজন তরুণ নেতা সম্মুখ সারিতে ছিলেন তাদের অন্যতম হলেন আব্দুল গাফফার জিসান। তিনি জুলাই আন্দোলনের সময় কেন্দ্রীয় সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করে স্বৈরাচার সরকারের বিদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। দলীয় নির্দেশে এবং ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের সাথে সমন্বয় করে আন্দোলনকালীন পুরো সময়টা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ক্যাম্পাসে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন পিডিএফ’র সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ‘সুবর্ণ নাগরিক অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন।
অন্যদিকে, তিনি ৫ আগস্টের আগে ছাত্রদলের নিয়মিত কমসূচিতে অংশ নিতেন। আন্দোলনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো বন্ধ হয়ে গেলে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের এলাকায় থেকে আন্দোলনে বেগবান করেছেন। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীকালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের প্রতিটি সামাজিক কাজে অংশ নেয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচিত মুখ হিসেবে পরিচিত পেয়েছেন।
আরেক জোর আলোচিত প্রার্থী মীর মশাররফ হোসেন হল ছাত্রদলের সভাপতি শেখ সাদী। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শুরু থেকেই সরব ছিলেন তিনি। নাটকের মঞ্চে অভিনয় থেকে শুরু করে বাংলা সংসদের শিক্ষা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন এই নেতা। এছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখ সারিতে ছিলেন তিনি। গণঅভ্যুত্থান পূর্ববর্তী সময়ে শাখা ছাত্রদলের মিটিং মিছিলে পরিচিত মুখ শেখ সাদী। জুলাই আন্দোলন পরবর্তীকালে শাখা ছাত্রদল আয়োজিত প্রতিটি প্রোগ্রামেই নিয়মিত অংশ নিয়েছেন এই নেতা। ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে জনপ্রিয়ও তিনি। তাই তার সম্ভাবনা অনেকটাই প্রবল বলে করছেন শাখা ছাত্রদলের অনেক নেতা।
আলোচনায় আছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল ছাত্রদলের সভাপতি হামিদুল্লাহ সালমান। তিনি গণঅভ্যুত্থানের আগে শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের দ্বারা নির্যাতনের স্বীকার হয়ে আলোচনায় আসেন। গণঅভ্যুত্থান পূর্ববর্তী সময় থেকে শাখা ছাত্রদলের নিয়মিত কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন বলে জানা গেছে। এছাড়া গণঅভ্যুত্থানে সামনের সারির পরিচিত মুখ তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্ক সংগঠন ডিবেটিং সোসাইটির কার্যকরী সদস্য হিসবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটবল টিমেরও পরিচিত মুখ তিনি।
এছাড়াও ছাত্রদলের অন্য আলোচিত প্রার্থীদের মধ্যে তালিকায় আছেন ৪৮তম ব্যাচের আরশাদ হাবিব বিশাল, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের মো: রুবেল হোসাইন, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের সাজ্জাদুল ইসলাম সাজ্জাদ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের মির্জা জাহিরুল ইসলাম, দর্শন বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী শহিদুল ইসলাম, সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের তানজিলা হোসেন বৈশাখী, ৫০তম ব্যাচের এ এম রাফিদুল্লাহ, শহীদ সালাম বরকত হল ছাত্রদলের সভাপতি সাইদুল ইসলাম, সেক্রেটারি আব্দুল্লাহ আলিফ, বাংলা বিভাগের ৫১তম ব্যাচের খাইরুল ইসলাম নাহিদ ও ইমন ভূইয়া (বাবু), ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের ৫২তম ব্যাচের আবিদা হক মাধুর্য ও রুহুল আমিন সুইট, ইতিহাস বিভাগের ৫১তম ব্যাচের নুরুল আজিজ, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ৫২তম ব্যাচের সামিন ইয়াাসার লাবিব, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের ৫২তম ব্যাচের আরাফাত রহমান ভূইয়া, পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের আবিদুর রহমান, সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ৫৩তম ব্যাচের মেহেদী হাসান। প্রার্থীরা মনোনয়ন সংগ্রহ করলেও দলীয় সিদ্ধান্তের উপরই আস্থা রাখতে চান।
এ বিষয়ে শাখা ছাত্রদলের শহীদ সালাম বরকত হলের সভাপতি কে এম সইদুল ইসলাম জানান, ‘জাকসু নির্বাচনের মনোনয়নপত্র নিয়েছি। দলীয় সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রাখতে চাই। শেষ পর্যন্ত দল যে পদে চাইবে সে পদেই নির্বাচন করবো।’
সার্বিক বিষয়ে শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব ওয়াসিম আহমেদ অনীক বলেন, ‘শাখা ছাত্রদল প্রার্থী বাছাই এখনো চূড়ান্ত করেনি। তবে শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয়, গ্রহণযোগ্য এবং আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা রাখা ত্যাগী নেতাকর্মীদের প্রার্থী করে একটি ইনক্লুসিভ প্যানেল দিতে প্রস্তুত শাখা ছাত্রদল।
শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন বাবর বলেন, ‘প্যানেল আগমীকাল ঘোষণা করা হবে। বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে যোগ্য, জনপ্রিয় এবং শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রার্থীকেই নির্বাচন করবে ছাত্রদল। আমরা যথেষ্ট সাড়া পাচ্ছি। তাই আমরা নির্বাচন নিয়ে আশাবাদী।’



