প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খানের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন।
আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ সাক্ষাতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, কৃষি, বাণিজ্য, শ্রম, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি ও রোহিঙ্গা সঙ্কটসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে নজরুল ইসলাম খান বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এ সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী ও ফলপ্রসূ করতে কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, প্রযুক্তি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও এখানে বিপুল জনগোষ্ঠীর বসবাস। দেশের মানুষের খাদ্য চাহিদা পূরণ ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষির আধুনিকায়ন, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষিপণ্যের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো জরুরি। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত ও কারিগরি সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নজরুল ইসলাম খান জানান, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রামীণ মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।
তিনি প্রধানমন্ত্রীর কৃষি কার্ড কর্মসূচির এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সম্ভাবনা অনুযায়ী বিশেষ পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের কার্যক্রম উল্লেখ করেন।
তিনি চরাঞ্চলসহ দুর্গম এলাকায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সুবিধা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এসব এলাকায় সৌরবিদ্যুৎসহ পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো গেলে কৃষি উৎপাদন, সেচ, পণ্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় কর্মসংস্থানে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বৈঠকে আমসহ বাংলাদেশের কৃষিপণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রফতানির সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন বলেন, কৃষিপণ্য উৎপাদনের পর মানসম্মতভাবে সংরক্ষণ, পরিবহন ও রফতানির জন্য কার্যকর কোল্ড চেইন এবং রেফ্রিজারেটেড পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। এসব অবকাঠামো ও প্রযুক্তি উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে আগ্রহী।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশে আসা মার্কিন পণ্য বন্দরে খালাসের ক্ষেত্রে বিদ্যমান দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা অত্যন্ত জরুরি বলে উল্লেখ করেন।
এ বিষয়ে নজরুল ইসলাম খান বলেন, সরকার বাণিজ্য সহজীকরণ, বন্দরের কার্যক্রমে গতি আনা এবং আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা দূর করতে কাজ করছে। শিগগিরই এসব সমস্যার সুরাহা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বৈঠকে শ্রমিকদের অধিকার, কর্মপরিবেশ, ট্রেড ইউনিয়ন এবং শ্রম আইন সংস্কার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। মার্কিন রাষ্ট্রদূত জাতীয় সংসদে ‘বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাসের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, সংশোধিত শ্রম আইনে শ্রমিকদের অধিকার ও সুরক্ষা জোরদার, আন্তর্জাতিক শ্রমমানের সঙ্গে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা এবং ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ ইতিবাচক।
নজরুল ইসলাম খান বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। সরকার এমন একটি শ্রমব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা সুরক্ষিত থাকবে, একই সাথে শিল্পের উৎপাদন ও বিনিয়োগের পরিবেশও বজায় থাকবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ শিল্প খাতে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও শ্রমমান উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। তবে এখানেই থেমে থাকার সুযোগ নেই। ট্রেড ইউনিয়নের কার্যক্রম শক্তিশালী করা, শ্রমিকদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি, মালিক-শ্রমিকের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। নজরুল ইসলাম খান বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কটের একটি নিরাপদ, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ সমাধান জরুরি। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকা এবং মিয়ানমারের ওপর প্রয়োজনীয় চাপ অব্যাহত রাখা দরকার।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, এটি একটি জটিল সংকট এবং এর সমাধানে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
শিক্ষা খাতের আলোচনায় বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার সুযোগ, যোগ্যতা যাচাই এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়নের বিষয় উঠে আসে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত জানান, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের কয়েকটি অঞ্চলে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু রেখেছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
তিনি আরো জানান, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতার অংশ হিসেবে সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। রোগ শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ, জনসচেতনতা এবং স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এ সহযোগিতা পরিচালিত হবে।
বৈঠকে উভয় পক্ষ বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করার পাশাপাশি কৃষি, বাণিজ্য, শ্রম, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এ বৈঠকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মো: মাহমুদুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যাটাশে এরিন কোভার্ট, পলিটিক্যাল অফিসার জেমস এ স্টুয়ার্ট এবং লেবার অ্যাটাশে লিনা খান।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন এবং সহকারী প্রেস সচিব শাহরিয়ার পামির বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।



