হুমায়ুন কবির

নির্বাচিত সরকার শক্ত অবস্থান থেকে রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে আলোচনা করতে পারবে

রোহিঙ্গা সঙ্কট বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য যেমন উদ্বেগের, তেমনি এর প্রভাব পুরো অঞ্চল এবং এর বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক সম্প্রদায়ের দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় অংশীদারদের সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশকে মিয়ানমারের সাথে সঙ্কট সমাধানে সহায়তা করা প্রয়োজন।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির |ইউএনবি

গণতান্ত্রিক সরকার না থাকায় মিয়ানমারের সাথে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল ছিল বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেছেন, এখন জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকায় বাংলাদেশ শক্ত অবস্থান থেকে রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে আলোচনা করতে পারবে।

আজ বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

মালয়েশিয়ায় আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরুর প্রসঙ্গ তুলে বাংলাদেশ কেন একইভাবে প্রত্যাবাসন শুরু করতে পারছে না- সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, মালয়েশিয়ায় গণতান্ত্রিক সরকার রয়েছে এবং দেশটিতে নির্বাচনের একটি প্রক্রিয়া ছিল। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘদিন কোনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ছিল না।

তিনি বলেন, ‘আমাদের তো কোনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াই ছিল না। কারণ সেটি ছুড়ে ফেলে দেয়া হয়েছিল। বাংলাদেশে আমাদের একটি নিপীড়নমূলক সরকার ছিল, যার নেতৃত্বে ছিল সন্ত্রাসী শেখ হাসিনা।’

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ওই সরকারের জনগণের ম্যান্ডেট ছিল না এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। ফলে মিয়ানমারের সাথে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনার সময় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল দুর্বল।

তিনি বলেন, নিজের দেশের মানুষের অনেক অধিকারই যারা কেড়ে নিয়েছিল, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের কিভাবে সম্মান করা হবে? মিয়ানমারও বিষয়টি জানত। ফলে তাদের সাথে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী ছিল না।

তার কথায়, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে শক্ত অবস্থান থেকে কথা বলার সুযোগ আমাদের ছিল খুবই দুর্বল। এখন আমাদের একটি নির্বাচিত সরকার আছে। আমরা শক্ত অবস্থান থেকে কথা বলব, কারণ আমাদের জনগণের ম্যান্ডেট রয়েছে।’

রোহিঙ্গা সঙ্কটকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগ হিসেবে উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, এ সঙ্কট সমাধানে একক কোনো পক্ষের পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়। এ জন্য বহু সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগের বিষয়। তাই আমরা এটি একসঙ্গে সমাধান করব। তবে এখানে বহু সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ লাগবে। একজন অংশীজনের পক্ষে একা সবকিছু সমাধান করা সম্ভব নয়।’

মিয়ানমার সরকারও এবার কোনো না কোনোভাবে বাংলাদেশের নির্বাচনে বিজয়ী সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে একটি সরকার ক্ষমতায় এসেছে- মিয়ানমারকে বিষয়টি উপলব্ধি করতে হবে এবং সেই সরকারকে সম্মান দিতে হবে।

‘এটাই আমাদের শক্ত অবস্থান। জনগণের ম্যান্ডেট ও অনুমোদন নিয়ে আমরা জোরালোভাবে এগিয়ে যাব এবং যত দ্রুত সম্ভব ধাপে ধাপে এ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করব,’ বলেন তিনি।

কূটনীতির মাধ্যমে দ্রুত সমাধানের চেষ্টা

রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দেয়া সম্ভব নয় জানিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে ধৈর্য ধরতে হবে। তবে সঙ্কটের জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কূটনীতির মাধ্যমে দ্রুততার সাথে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে যত দ্রুত সম্ভব এই সঙ্কটের সমাধান করতে চায় বাংলাদেশ।

হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আপনি বলতে পারেন না যে আমি আগামীকালই এটির সমাধান করব। কিন্তু আমরা এটি সমাধান করব এবং আমরা আত্মবিশ্বাসী যে এতে অগ্রগতি হবে। ইনশা আল্লাহ, আমরা একটি পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছাব।’

জাতিসঙ্ঘে রোহিঙ্গা সঙ্কটের গুরুত্ব বাড়াবে বাংলাদেশ

জাতিসঙ্ঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের সভাপতিত্বকে কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গা সঙ্কটকে আবারো আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসার কথা জানান হুমায়ুন কবির।

তিনি বলেন, ‘আমরা জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের সভাপতিত্বকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের প্রধান বহুপক্ষীয় এই ফোরামে আবারো এই সঙ্কটের গুরুত্ব তুলে ধরব।’

চীন, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, আসিয়ানসহ গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় অংশীদার এবং জাতিসঙ্ঘের সংস্থাগুলোর সাথে বাংলাদেশ কাজ করবে বলেও জানান তিনি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, এসব অংশীদারের সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করে ধাপে ধাপে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের টেকসই ও শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি করতে চায় বাংলাদেশ।

রোহিঙ্গা সঙ্কট শুধু বাংলাদেশের নয়

বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে প্রয়োজনের সময়ে সর্বোচ্চ মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, বিশ্বের কোনো ইউরোপীয় বা উত্তর আমেরিকান দেশ এ ধরনের সঙ্কটে এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে আশ্রয় দিতে রাজি হতো না।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের নিজস্ব জনগণের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সাথে রোহিঙ্গা সঙ্কটকে শুধু বাংলাদেশের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

‘এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। বাংলাদেশ এরই মধ্যে যথেষ্ট করেছে। এটি বিশ্বেরও সমস্যা এবং তাদের একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে,’ বলেন তিনি।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শুধু সংহতি প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে অর্থায়ন এবং সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সঙ্কট সমাধানে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য যেমন উদ্বেগের, তেমনি এর প্রভাব পুরো অঞ্চল এবং এর বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক সম্প্রদায়ের দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় অংশীদারদের সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশকে মিয়ানমারের সাথে সঙ্কট সমাধানে সহায়তা করা প্রয়োজন।

সূত্র : ইউএনবি