তিস্তা নদী মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন প্রকল্প এবং মোংলা বন্দর আধুনিকীকরণ প্রকল্পে চীনা বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ। একইভাবে চট্টগ্রামের চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল উন্নয়নে একসাথে কাজ করতে চায়। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ‘এক চীন নীতির’ প্রতি অটল প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে এবং তাইওয়ানকে চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
শুক্রবার (২৮ মার্চ) চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে দেশটিতে সফররত প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বৈঠক শেষে এক যৌথ বিবৃতিতে এসব তথ্য উঠে আসে। এদিন সকালে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, এশিয়ার বোয়াও ফোরামের সেক্রেটারি জেনারেলের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস গত বুধ ও বৃহস্পতিবার চীনের হাইনান প্রদেশে বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নেন। পরে চীন সরকারের আমন্ত্রণে বৃহস্পতিবার রাতে বেইজিং আসেন। শনিবার দেশে ফিরে যাবেন।
বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎ করেন। চীনের উপ-প্রধানমন্ত্রী ডিং শুয়েশিয়াং হাইনান প্রদেশে বোয়াও ফোরামের সাইডলাইনে প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎ করেন। চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেং-ও বেইজিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎ করেন।
উষ্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে উভয় পক্ষ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয়ে গভীর আলোচনা করে এবং বিস্তৃত সম্মতিতে পৌঁছায়। প্রধান উপদেষ্টা বোয়াও ফোরামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ দেন।
চীন সরকার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে স্বাগত জানায় এবং আগস্ট ২০২৪ থেকে সরকারের নেয়া সংস্কার ও অগ্রগতির প্রশংসা করে। বাংলাদেশ চীন সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো এগিয়ে নিতে সম্মিলিত প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে। উভয় পক্ষ সমগ্র কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্বের গুরুত্ব পুনরায় নিশ্চিত করে।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, দুই দেশ একমত হয়েছে যে, চীন ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিবর্তনের মধ্যেও এই সম্পর্ক সুসংহত ও স্থিতিশীলভাবে বিকশিত হয়েছে। উভয় পক্ষ পাঁচটি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি মেনে চলার, পারস্পরিক আস্থা আরো গভীর করার এবং উন্নয়ন কৌশলের সমন্বয় জোরদার করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে।
উভয় দেশ একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও প্রধান স্বার্থে পারস্পরিক সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে বিবৃতিতে বলা হয়, চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করে এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি মেনে চলে। চীন বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতায় সমর্থন জানায়। বাংলাদেশ ‘এক চীন নীতির’ প্রতি অটল প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে এবং তাইওয়ানকে চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
উভয় পক্ষ ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের অধীনে উচ্চমানের সহযোগিতা জোরদার করতে সম্মত হয় জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ মোংলা বন্দর আধুনিকীকরণ প্রকল্পে চীনা বিনিয়োগকে স্বাগত জানায় এবং চট্টগ্রামের চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল উন্নয়নে একসাথে কাজ করতে চায়।
বাংলাদেশ ও চীন সরকারের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, চীন-বাংলাদেশ মুক্তবাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) আলোচনা দ্রুত শুরুর এবং বাংলাদেশী পণ্য চীনে রফতানি বৃদ্ধি করার বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয়। বাংলাদেশ চীনা কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। উভয় দেশ জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা, বন্যা প্রতিরোধ, নদী খনন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহযোগিতা বৃদ্ধিতে সম্মত হয়। বাংলাদেশ তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীনা বিনিয়োগকে স্বাগত জানায়।
বিবৃতিতে উভয় পক্ষ ২০২৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি ও ‘বাংলাদেশ-চীন জনসংযোগ বর্ষ’ উদযাপনের বিষয়ে একমত হয়। বাংলাদেশ চীনের দেয়া স্বাস্থ্যসেবা সুবিধার প্রশংসা করে, যা ইউনান প্রদেশে বাংলাদেশী রোগীদের চিকিৎসার সুযোগ প্রদান করে।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ ‘মানবজাতির অভিন্ন ভবিষ্যৎ গঠনের চীনা দৃষ্টিভঙ্গি’ এবং ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’-এর প্রশংসা করে। উভয় পক্ষ গ্লোবাল সাউথের ঐক্য ও স্বনির্ভরতা বাড়াতে একসাথে কাজ করবে। উভয় পক্ষ জাতিসঙ্ঘ সনদের মূলনীতি মেনে চলার এবং বহুপক্ষীয়তাকে সমর্থন করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে। উভয় দেশ আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষার জন্য কাজ করবে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত জনগণের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে চীনের গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করে বাংলাদেশ।
চীন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করতে সহযোগিতা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ড. ইউনূসের সফরের সময় উভয় দেশ অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক বিনিময়, সংবাদ ও গণমাধ্যম, স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং চীনা জনগণের উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং চীনের নেতৃবৃন্দকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
এই যৌথ বিবৃতিটি চীন ও বাংলাদেশের কৌশলগত অংশীদারিত্বের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



