মোংলা বন্দরে ‘ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ’ ঘোষণা দিয়ে তিন থেকে চারটি বড় খণ্ডে কেটে আনা চারটি বিলাসবহুল গাড়ির চালান শনাক্ত করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর (সিআইআইডি)। সংস্থাটির অনুসন্ধানে এসব খণ্ডে গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য অংশ বা বিদ্যমান থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে।
আজ বৃহস্পতিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
এতে বলা হয়, পৃথক গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা করা হলেও পরীক্ষায় পাওয়া অংশগুলো পুনরায় সংযোজন করলে গাড়ির মূল কাঠামো ও বৈশিষ্ট্য পুনর্গঠন করা সম্ভব। ফলে চালানটি সাধারণ ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ নয়, বরং আংশিক সংযোজিত অবস্থায় মোটরযান আমদানির চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে।
চালানটিতে থাকা চারটি গাড়ির বাজারমূল্য প্রায় চার কোটি ৫০ লাখ থেকে ছয় কোটি ৭০ লাখ টাকা বা তারও বেশি। বিপরীতে পুরো চালানটি ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা করে ইনভয়েস মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র সাত হাজার ৯৩৫ মার্কিন ডলার। শুল্কায়নযোগ্য মূল্য দেখানো হয়েছে প্রায় নয় লাখ ৯৩ হাজার ৫৪৭ টাকা এবং শুল্ক-করসহ পরিশোধযোগ্য অর্থ ছয় লাখ ১০ হাজার ৩০ টাকা।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চালানটির বিল অব অ্যান্ট্রি নম্বর সি-৬৯০৪। আমদানিকারক ঢাকার গেন্ডারিয়ার ক্রাউন অটো মোবাইল সার্ভিসেস এবং সিঅ্যান্ডএফ অ্যাজেন্ট খুলনার এসটি ইন্টারন্যাশনাল। জাপানের মাহি কার পোর্ট থেকে পণ্যগুলো আনা হয়।
এনবিআর জানায়, চালানটিতে ১৪ ধরনের পণ্যের মোট ১৬৪টি প্যাকেজ ছিল। ঘোষিত পণ্যের মধ্যে ছিল ব্যবহৃত দরজা, ২০০০ সিসি পেট্রোল ইঞ্জিনসহ গিয়ার অ্যাসেম্বল, সাসপেনশন শক অ্যাবসরবার, নোজ কাট, হেড লাইট, টেইল লাইট, ফেন্ডার, কেবিন, স্টিরিং হুইল, বাম্পার ইত্যাদি।
এনবিআর জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয় এবং মোংলা সার্কেল চালানটির খালাস কার্যক্রম স্থগিত করে। পরে গত ১৯ জুলাই চালানটির শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করা হয়।
পরীক্ষার সময় বিআরটিএ ও খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহায়তা নেয়া হয়। পাশাপাশি গাড়ির বিভিন্ন অংশে থাকা স্টিকার, লেবেল, চিহ্ন ও নম্বর বিশ্লেষণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সহায়তায় গাড়িগুলোর পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
পরীক্ষায় ঘোষিত আলাদা গাড়ির যন্ত্রাংশের বিপরীতে বৈদ্যুতিক তারের সংযোগ ব্যবস্থা, সংবেদক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ সংযুক্ত অবস্থায় সামনের কাটা অংশ, সম্পূর্ণ পেছনের কাটা অংশ, সামনের ও পেছনের অংশ কাটা ও ছাদ কাটা প্যানেল এসেম্বল পাওয়া যায়। অর্থাৎ সাধারণ খুচরা যন্ত্রাংশের মতো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন না করে গাড়িগুলোকে কয়েকটি বড় অংশে কেটে আমদানি করা হয়েছে বলে কাস্টমস গোয়েন্দার অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয়েছে।
শনাক্ত চারটি গাড়ির মধ্যে রয়েছে ২০১৭ মডেলের রেঞ্জ রোভার ভোগ, ২০১০ মডেলের বিএমডাব্লিউ ৬৫০ আই, ২০১৬ মডেলের লেক্সাস এলএক্স৫৭০ এবং টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেট। এর মধ্যে রেঞ্জ রোভারের বাংলাদেশী বাজারমূল্য প্রায় এক কোটি ৬০ লাখ থেকে এক কোটি ৮৫ লাখ টাকা, বিএমডাব্লিউর ৬০ থেকে ৯০ লাখ টাকা, লেক্সাসের দুই কোটি থেকে তিন কোটি ৫০ লাখ টাকার বেশি এবং টয়োটা ক্রাউনের এর ৩০ থেকে ৪৫ লাখ টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কাস্টমস গোয়েন্দার হিসাবে, চারটি গাড়ির সম্ভাব্য বাজারমূল্য চার কোটি ৫০ লাখ থেকে ছয় কোটি ৭০ লাখ টাকা বা তারও বেশি হতে পারে। তবে এগুলো আনুমানিক বাজারমূল্য; চূড়ান্ত মূল্যায়ন ও শুল্ক-কর নির্ধারণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের শুল্কায়নের মাধ্যমে হবে।
এনবিআর জানায়, চালানটির ইনভয়েস মূল্য সাত হাজার ৯৩৫ মার্কিন ডলার। ঘোষণায় প্রতি ডলারের বিনিময় হার ১২২.৭৪৩৩ টাকা এবং অন্যান্য ব্যয় ১৯ হাজার ৫৭৭ টাকা ধরে শুল্কায়নযোগ্য মূল্য নির্ধারণ করা হয় প্রায় নয় লাখ ৯৩ হাজার ৫৪৭ টাকা। এর ওপর শুল্ক-কর দেখানো হয় ছয় লাখ সাত হাজার ৩৯৬ টাকা এবং অন্যান্য অর্থসহ মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ ছয় লাখ ১০ হাজার ৩০ টাকা।
তবে গাড়িগুলোকে পৃথক ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে না দেখিয়ে জিআরআই আইন অনুযায়ী আংশিক সংযোজিত অবস্থায় সম্পূর্ণ মোটরযান হিসেবে শ্রেণিবিন্যাস করা হলে কত শুল্ক-কর প্রযোজ্য হতো, তা এখন নির্ধারণ করা হচ্ছে। গাড়ির প্রকৃত মূল্য, ইঞ্জিনের ক্ষমতা, বয়স, অবচয় এবং প্রযোজ্য শুল্ক-করসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে রাজস্ব ফাঁকির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে।
আইন অনুযায়ী কোনো পণ্য অসম্পূর্ণ, অসমাপ্ত বা খণ্ডিত অবস্থায় থাকলেও তাতে যদি সম্পূর্ণ পণ্যের ‘অ্যাসেনশিয়াল ক্যারেক্টার’ বিদ্যমান থাকে, তাহলে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সেটিকে সম্পূর্ণ পণ্য হিসেবে শ্রেণিবিন্যাস করা যায়। পরীক্ষায় পাওয়া অংশগুলোর ধরন ও বিন্যাস বিবেচনায় এসব গাড়ির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ মোটরযানের অ্যাসেনশিয়াল ক্যারেক্টার বিদ্যমান বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র : বাসস



