বাংলাদেশ রেলওয়ে বিভাগে পদোন্নতি ও রদবদল নিয়ে অনিয়ম, জালিয়াতি, আর্থিক লেনদেন ও নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি রেলওয়ের দুই অঞ্চল থেকে ১৩ জন কর্মকর্তাকে রদ-বদল করেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। গত বছরের ১১ ডিসেম্বর জোন ট্রান্সফার আদেশ করে বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। আদেশে দেখা যায়- পশ্চিমাঞ্চল রাজশাহী থেকে ছয়জনকে পূর্বাঞ্চল এবং চট্টগ্রাম থেকে সাতজনকে পশ্চিমাঞ্চলে বদলি করা হয়।
বদলি আদেশ পাওয়ার পর অনেকেই স্ব-স্ব দফতর থেকে ছাড়পত্র নিয়ে কর্মস্থলে যোগদান করেছেন। কিন্তু প্রায় সবাই কর্মস্থলে যোগদান করলেও পাকশী ঈশ্বরদী ১১ নম্বর কাচারির কানুনগো শরিফুল ইসলাম কর্মস্থলে যোগদান করেননি বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা।
এস্টেট বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলছেন, শরিফুলের বিরুদ্ধে এত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও মন্ত্রণালয়ের বদলি আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কর্মস্থলে যোগদান না করার অবস্থানে অনড় তিনি।
এর আগে, ২০২৪ সালে ১১ ফেব্রুয়ারি আমিন থেকে কানুনগো পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ শরিফুলকে ৮নং কাচারি পার্বতীপুর বদলি করেন পাকশীর সাবেক ডিইও আরিফুল ইসলাম। পার্বতীপুর যোগদানের পরই লিজ জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
জানা যায়, পার্বতীপুর মধ্যপাড়া স্টেশন এলাকায় রেলওয়ের আট একর জমি ভোগ দখলকারীর লাইসেন্স বাতিল করে অন্য এক ব্যক্তির নামে শরিফুলের সুপারিশে লিজ দেয় পাকশীর সাবেক ডিইও আরিফুল ইসলাম। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে একজন নিহত হন।
এই ঘটনায় দিনাজপুর ফুলবাড়িয়া থানা একটি মামলা দায়ের হয়। এ বিষয়ে ফুলবাড়িয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) বলেন, আমি নতুন এসেছি। তবে রেলওয়ের জমির বিরোধের ঘটনায় থানায় একটি মামলা রয়েছে।
এরপর শরিফুলকে পার্বতীপুর থেকে একই বছরের ৩১ জুলাই বদলি করে আবার পাকশি নিয়ে আসে সাবেক ডিইও আরিফুল ইসলাম। যার অফিস আদেশ নং-৩৩৩। শরিফুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আসায় গত বছর ২৫ সেপ্টেম্বর তার বদলি আদেশ স্থগিত করে মন্ত্রণালয়।
রেলওয়ের এই আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শরিফুল পার্বতীপুর কর্মস্থলে যোগদান না করে ঈশ্বরদীতেই বহাল থাকেন। গত ১১ ডিসেম্বর ১৩ জনের বদলি আদেশ করে রেলপথ মন্ত্রণালয়। ছাড়পত্র নিয়ে সবাই কর্মস্থলে যোগদান করেন। কিন্তু শরিফুল অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে চট্টগ্রাম যোগদান না করে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ছুটি কাটাচ্ছেন।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, শরিফুলের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এত কিছুর পরও মন্ত্রণালয়ের আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে স্বপদে বহাল রয়েছেন।
এদিকে ২০২৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি আমিন থেকে কানুনগো পদে নীতিমালা লঙ্ঘন করে জালিয়াতির মাধ্যমে পদোন্নতি দেয়া হয় তিনজনকে। শতকরা ২০ ভাগে পদোন্নতি পান ৪ জন। জালিয়াতির মাধ্যমে সেখানে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে ৬ জনকে। পদোন্নতি প্রাপ্তরা হলেন- হীরেন্দ্রনাথ সরকার, শরিফুল ইসলাম এবং আলিমুর রাজিব।
এর আগে, ২০১৬ সালে তিনজনকে পদোন্নতি দেয়া হয়। পদোন্নতি প্রাপ্তরা হলেন- শহীদুজ্জামান, মহসিন এবং ফোরকান। পরের তিনজনের পদোন্নতির ঘটনায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের জন্য গত বছর ডিসেম্বরে পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক জিএমকে চিঠি দেন রেলওয়ে মহাপরিচালক। পাকশী ডিইওকে আহ্বায়ক করে ৩ সদস্যের কমিটি গঠনের চিঠি দেয় রাজশাহী জিএম ফরিদ আহমেদ। কমিটির আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম অপারগতা প্রকাশ করে গত ২৬ ডিসেম্বর জিএমকে চিঠি দেন ডিইও।
মহাব্যবস্থাপক জিএমের পক্ষে মহাপরিচালকের বরাবরে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দ্বারা কমিটি গঠনের সুপারিশ পত্র লেখার জন্য রাজশাহী সদরের প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন গত ৪ জানুয়ারি। ১৭ দিন পর গত ২১ জানুয়ারি বুধবার সেই চিঠি লেখা শেষ করেন রাজশাহী প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা। বিলম্বের বিষয় রাজশাহীর জিএম ফরিদ আহমেদ বলেন, সিইও নাদিম সারোয়ারকে বলা হলেও বিষয়টি ভুলে যান বলে জানান।
শরিফুলের ছুটির বিষয় পাকশীর ডিইও শফিকুল ইসলাম বলেন, ছুটির দরখাস্ত দিয়েছিলেন তিনি, তবে নামঞ্জুর করে তাকে কর্মস্থলে যোগদানের জন্য ছাড়পত্র প্রদান করেছি। শরিফুল তার দায়িত্ব কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দিয়ে চলে গেছে।



