সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি পরীক্ষার্থী দিয়ে পরীক্ষা দেয়ানো এবং প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে অন্যদের চাকরি পাইয়ে দেয়ার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় ৪৫তম বিসিএসে সমবায় ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত একজনসহ আরো দুই সরকারি চাকরিজীবীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) নোয়াখালী জেলা ইউনিট।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) তাদের গ্রেফতার করা হয় বলে শুক্রবার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে সিআইডি।
গ্রেফতারকৃত আসামিরা হলেন- নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার খালিশপুর গ্রামের মোজফা মুন্সীর ছেলে নুরন্নবী (৫৫), লক্ষ্মীপুর জেলার সদর উপজেলার হাসুন্দীর (করিম বক্স ব্যাপারী বাড়ি) মো: আবুল কালামের ছেলে মো: সোহেল (৪০), ও নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার নতুন সুখচরের ম্যাকপার্শানের (বেলাল মিয়ার বাড়ি) সাইফুল্লাহর ছেলে জুলফিকার আলী ওরফে রায়হান (২৯)।
গ্রেফতারকৃত নুরন্নবী ও মো: সোহেল কর অঞ্চল-২, বিভাগীয় কর কমিশনারের কার্যালয়, আগ্রাবাদ, চট্টগ্রামে অফিস সহায়ক হিসেবে কর্মরত। অপরদিকে জুলফিকার আলী বর্তমানে মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পে জুনিয়র সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত। তিনি সম্প্রতি ৪৫তম বিসিএসে সমবায় ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের অনুমোদনের ভিত্তিতে কর অঞ্চল-নোয়াখালীতে গ্রেড-১৩ থেকে গ্রেড-২০ পর্যন্ত বিভিন্ন পদে জনবল নিয়োগের লক্ষ্যে অনলাইনে আবেদন আহ্বান করা হয়। গত ৫ জুন নোয়াখালীর তিনটি কেন্দ্রে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। লিখিত, ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে প্রাথমিকভাবে ১১২ জন প্রার্থীকে নির্বাচিত করা হয় এবং চূড়ান্ত নিয়োগের লক্ষ্যে ২১ জুন প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ যোগদানের নির্দেশনা দেয়া হয়।
যোগদানের সময় প্রার্থীদের আবেদনপত্র, শিক্ষাগত সনদ ও অন্যান্য কাগজপত্র যাচাইয়ের একপর্যায়ে মো: কামাল উদ্দিন (অফিস সহায়ক পদে মনোনীত) ও মো: নাসফুরুল্লাহর (অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে মনোনীত) স্বহস্তে লিখিত তথ্যের সাথে মৌখিক পরীক্ষার সময় পূরণ করা চেকলিস্টের হাতের লেখার অসঙ্গতি ধরা পড়ে। পরে তাদের পুনরায় একই লেখা লিখতে দিলে হাতের লেখায় স্পষ্ট অমিল পরিলক্ষিত হয়। এতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সন্দেহের সৃষ্টি হলে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে মো: কামাল উদ্দিন স্বীকার করেন যে, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় তিনি নিজে অংশগ্রহণ করেননি; তার পরিবর্তে অপর এক ব্যক্তি প্রক্সি পরীক্ষার্থী হিসেবে পরীক্ষা দিয়েছেন। একইভাবে মো: নাসফুরুল্লাহও স্বীকার করেন যে, লিখিত, ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষায় তার পরিবর্তে অন্য ব্যক্তি অংশ নিয়েছিলেন। পরে ২২ জুন পুনরায় যাচাইকালে মো: সুজনের হাতের লেখায়ও অসঙ্গতি ধরা পড়ে। এ সময় তার সাথে থাকা রাশেদ উদ্দিন কৌশলে পালিয়ে যান। জিজ্ঞাসাবাদে মো: সুজনও প্রক্সি পরীক্ষার্থীর মাধ্যমে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন।
এ ঘটনা যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সিআইডি নোয়াখালী অবগত হলে শুরু থেকেই মামলাটি তারা ছায়া তদন্ত শুরু করে।
এ ঘটনায় ১. মো: কামাল উদ্দিন (৩১), বাবা- মো: আনছারুল হক, সাং- গুল্লাখালী, হাতিয়া, নোয়াখালী; ২. মো: নাসফুরুল্লাহ (৩১), বাবা- মো: আলী উল্লাহ, সাং- ব্রহ্মপুর, নোয়াখালী সদর, নোয়াখালী; এবং ৩. মো: সুজন (২১), বাবা- তৈয়ব উল্যাহ, সাং- শ্যামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর সদর, লক্ষ্মীপুর—এই তিনজনকে নোয়াখালী জেলার সুধারাম মডেল থানায় সোপর্দপূর্বক একটি মামলা (সুধারাম মডেল থানায় মামলা নং-৪৫, তারিখ ২২ জুন ২০২৬, ধারা- ৪১৯/৪২০/৪৬৮/৪৭১/১০৯/৩৪ পেনাল কোডের) রুজু করা হয়।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় শুরু থেকেই সিআইডির নোয়াখালী জেলা ইউনিট মামলাটির ছায়া তদন্ত শুরু করে। পরে মামলাটি সিআইডির তফসিলভুক্ত হলে তদন্তভার গ্রহণ করে সিআইডি।
গ্রেফতার হওয়া তিন আসামির দেয়া তথ্য ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সিআইডি জানতে পারে, একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যরা অর্থের বিনিময়ে প্রক্সি পরীক্ষার্থী সরবরাহ করে বিভিন্ন সরকারি চাকরির পরীক্ষায় প্রকৃত প্রার্থীদের পরিবর্তে অংশগ্রহণ করতেন। এ চক্রের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ৩০ জুলাই পৃথক অভিযানে নুরন্নবী ও মো: সোহেলকে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদস্থ কর অঞ্চল-২ কার্যালয় থেকে এবং জুলফিকার আলী ওরফে রায়হানকে কক্সবাজারের মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা থেকে ঢাকার উদ্দেশে পালিয়ে যাওয়ার সময় গ্রেফতার করা হয়।
এ নিয়ে এ মামলায় মোট ছয়জন এজাহারনামীয় আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃত আসামিদের শুক্রবার (৩১ জুলাই) আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। মামলার তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এ সংঘবদ্ধ জালিয়াতি চক্রের সাথে জড়িত অন্যান্য ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে সিআইডির অভিযান চলমান রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে।



