রাজধানী থেকে দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ সিসার চালান জব্দ

অনলাইনে পরিচালিত সংঘবদ্ধ সিসা সরবরাহকারী চক্রের ৩ সদস্য গ্রেফতার

একটি চক্র দীর্ঘদিন যাবৎ একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনার মাধ্যমে ঢাকাসহ সারাদেশে অনলাইনে অবৈধ সিসা ও সিসা সেবনের উপকরণ বিক্রয় ও সরবরাহ করে আসছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
মাদকসহ গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিরা
মাদকসহ গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিরা |সংগৃহীত

সম্প্রতি রাজধানীর গুলশান ও ভাটারা এলাকায় পরিচালিত এক সমন্বিত বিশেষ অভিযানে দেশের ইতিহাসে একক অভিযানে সর্বাধিক পরিমাণ সিসা উদ্ধারসহ একটি আন্তঃজেলা অনলাইন মাদক চক্রের মূলহোতা দুই সহোদরসহ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি)।

শুক্রবার (৩ জুলাই) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে ডিএনসি।

এতে জানানো হয়, ডিএনসি ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের কাছে গোপন সংবাদ ছিল যে, আহমেদ শরীফি (৩৪) ও মেহদাদ শরীফি (৩৪) নামে দুই সহোদরের নেতৃত্বাধীন একটি চক্র দীর্ঘদিন যাবৎ একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনার মাধ্যমে ঢাকাসহ সারাদেশে অনলাইনে অবৈধ সিসা ও সিসা সেবনের উপকরণ বিক্রয় ও সরবরাহ করে আসছে। প্রাপ্ত সংবাদের সূত্র ধরে আরো জানা যায়, ওই পেজের মাধ্যমে অর্ডারকৃত সিসার দু’টি চালান দেশীয় কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে পাঠানো হবে।

তথ্যের সত্যতা যাচাই করে ডিএনসি ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো: মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে একটি বিশেষ রেইডিং টিম বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাজধানীর ভাটারা থানাধীন বসুন্ধরা এলাকায় প্রথম অভিযান পরিচালনা করে। সেখান থেকে ওই ফেসবুক পেজের নামে পাঠানো এক কেজি সিসাসহ একটি পার্সেল জব্দ করা হয়। অতঃপর একই দিন রমনা থানাধীন মালিবাগ থেকে একই পেজের নামে পাঠানো এক কেজি সিসাসহ দ্বিতীয় পার্সেলটি জব্দ করা হয়।

জব্দকৃত পার্সেল দু’টির প্রেরক-ঠিকানা যাচাই করে অভিযানিক দল একই দিনে গুলশান থানাধীন কালাচাঁদপুরে একটি ফ্ল্যাটে হানা দেয়, যা মূল অভিযুক্ত দুই সহোদর আহমেদ শরীফি ও মেহদাদ শরীফির ভাড়াকৃত বাসা ছিল। এসময় উভয়কে হাতেনাতে আটক করা হয়। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ ও তাদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ফ্ল্যাট তল্লাশি চালিয়ে আরো ৪৫ কেজি ৯০০ গ্রাম সিসা ও ২০টি হুক্কা উদ্ধার করা হয়।

আটক দুই সহোদরের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, তাদের সরবরাহকৃত সিসার একটি বড় অংশ আসত মো: মাকসুদ আলম (৪০) নামে আরেক ব্যক্তির কাছ থেকে, যিনি ভাটারা থানাধীন নূরেরচালা এলাকায় বসবাস করেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে ওইদিন রাতে অভিযানিক দলটি নূরেরচালাস্থ তার ভাড়া ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে। পরে তল্লাশি চালিয়ে সেখান থেকে আরো ১৮ কেজি সিসা ও ২১টি হুক্কা উদ্ধার করা হয়।

চার স্থানে পরিচালিত এই সমন্বিত অভিযানে সর্বমোট ৬৫ কেজি ৯০০ গ্রাম সিসা, ৪১টি হুক্কা, ৪০ কেজি সিসা সেবনের কয়লা ও মাদক কারবারের কাজে ব্যবহৃত পাঁচটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়।

ডিএনসি জানিয়েছে, এটি দেশে এ পর্যন্ত এক অভিযানে জব্দকৃত সর্ববৃহৎ সিসার চালান, যা অধিদফতরের মাদকবিরোধী কার্যক্রমের একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ফেসবুক পেজের মাধ্যমে দেশব্যাপী ব্যবসা

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। জানা যায়, গ্রেফতারকৃত দুই সহোদর আহমেদ শরীফি ও মেহদাদ শরীফি দীর্ঘ সময় ইরানে অবস্থান করেছিলেন। সেখানে অবস্থানকালে তারা সিসা ব্যবসার কার্যক্রম, বাজারব্যবস্থা এবং সরবরাহ পদ্ধতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।

পরে বাংলাদেশে ফিরে তারা একই ব্যবসায়িক মডেল অনুসরণ করে অনলাইনে সিসা বিক্রির নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন এবং ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন জেলায় তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেন বলে তদন্তে জানা গেছে। তারা একটি ফেসবুক পেজ চালু করেন, যা বাংলাদেশে অনলাইনে সিসা বিক্রয়কারী প্রথম দিকের পেজগুলোর অন্যতম বলে জানা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে গ্রাহকদের সাথে যোগাযোগ, পণ্যের ছবি প্রকাশ, অর্ডার গ্রহণ, মূল্য নির্ধারণ এবং ডেলিভারির সমন্বয় করা হতো। অর্ডার নিশ্চিত হওয়ার পর দেশীয় কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পার্সেল পাঠানো হতো।

মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ

চক্রটি মূলত বিভিন্ন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করে পণ্যের মূল্য গ্রহণ করত। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, বিভিন্ন ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত একাধিক এমএফএস ব্যবহার করে তারা অর্থ সংগ্রহ করত, যাতে প্রকৃত লেনদেনের উৎস ও সুবিধাভোগীদের পরিচয় গোপন রাখা যায়। ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এসব আর্থিক লেনদেন, সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট ও অর্থের প্রবাহ যাচাই করা হচ্ছে।

বিপুল সংখ্যক ক্রেতার তথ্য উদ্ধার

অভিযানে জব্দকৃত মোবাইল ফোন, ডিজিটাল ডিভাইস এবং অনলাইন অ্যাকাউন্ট থেকে একটি বিস্তৃত গ্রাহক ডাটাবেস উদ্ধার করা হয়েছে। এতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার অসংখ্য ক্রেতার তথ্য, যোগাযোগের ইতিহাস, অর্ডারের বিবরণ এবং লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেছে। উদ্ধারকৃত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিয়মিত ক্রেতা, পরিবেশক, সহযোগী এবং এই নেটওয়ার্কের অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত করার কাজ চলমান রয়েছে।

জব্দকৃত মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণে এই চক্রের বিভিন্ন অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাথমিক তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে যে, অবৈধ সিসা বিক্রির পাশাপাশি তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক আরো বিভিন্ন অনৈতিক কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত ছিল। এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর সরকারের মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, আধুনিক প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও ডিজিটাল তদন্ত সক্ষমতা ব্যবহার করে দেশব্যাপী অভিযান পরিচালনা করছে। বর্তমানে মাদক ব্যবসায়ীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-কমার্স, কুরিয়ার সেবা ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করে নতুন কৌশলে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করছে। এসব অপরাধ দমনে ডিএনসি তার সাইবার নজরদারি, আর্থিক গোয়েন্দা বিশ্লেষণ এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বিত অভিযান আরো জোরদার করেছে।