নীলফামারীতে শিশু শিক্ষার্থীদের দেয়া হচ্ছে পচা ডিম, নিম্নমানের রুটি-কলা

পুষনা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতিনিয়ত নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করা হয়। কয়েকদিন আগে ওই স্কুলে শিক্ষার্থীদের মাঝে পচা ডিম বিতরণ করা হলে আমরা বিষয়টি প্রধান শিক্ষককে অবহিত করি।

কিশোরগঞ্জ (নীলফামারী) সংবাদদাতা

Location :

Kishoreganj
পচা ডিম ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি রুটি খাওয়ানো হচ্ছে স্কুলের শিশু শিক্ষার্থীদের
পচা ডিম ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি রুটি খাওয়ানো হচ্ছে স্কুলের শিশু শিক্ষার্থীদের |নয়া দিগন্ত

চুক্তিবন্ধ বেকারিতে অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে তৈরি হচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ফিডিং কর্মসূচির রুটি। নোংরা পরিবেশে তৈরি এসব প্যাকেটজাত খাবার খাওয়ার ফলে শিশুদের শরীরে পুষ্টি যোগানের পরিবর্তে স্বাস্থ্য ঝুঁকির আশঙ্ক্ষা দেখা দিয়েছে।

সাপ্তাহিক রুটিনে পচা ডিম ও কৃত্রিমভাবে পাকানো কলা দেয়ার অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এসব চিত্র দেখা গেছে নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়াতে ও শিশুদের পুষ্টি চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে সরকার ইকো সোস্যাল ডেভলেপম্যান্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। সংস্থাটি কিশোরগঞ্জ উপজেলার ১৭৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২১ হাজার ৩৩৪ জন শিক্ষার্থীর জন্য স্কুল ফিডিং কর্মসূচি (মিডডে মিল) প্রকল্পের আওতায় খাদ্য সরবরাহ করে আসছে। প্রকল্পের নীতিমালা অনুযায়ী সপ্তাহে ছয় দিন রুটিন মোতাবেক রুটি, কলা, ডিম ও দুধ সরবরাহ করার কথা।

২৮ এপ্রিল ১ নম্বর উত্তর চাঁদখানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সরঞ্জাবাড়ি বটতলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ওই বিদ্যালয় দু’টিতে চুক্তিবদ্ধ এনজিওর একজন কর্মী ছোট ছোট (চাম্পা) কলা নিয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কক্ষের সামনে দাড়িয়ে আছেন। এ সময় দেখা যায়, কলাগুলোর মধ্যে অনেক কলা থেঁতলে গিয়ে কালো হয়ে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে কলাগুলো কৃত্রিমভাবে পাকানো হয়েছে।

এ সময় ওই কর্মীকে কলার সাইজ এত ছোট কেন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, কলা প্রতি বরাদ্দ পাঁচ টাকা। তাই এর থেকে বড় কলা দেয়া সম্ভব নয়। অথচ সরকারিভাবে প্রতি পিস কলার বরাদ্দ ১০ টাকা ধরা হয়েছে।

পরদিন ২৯ এপ্রিল চাঁদখানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চড়কবন প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাগুড়া ইউনাইটেড প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণির একাধিক শিক্ষার্থী সাথে কথা বললে তারা জানান, সপ্তাহে কোনো কোনো দিন আমাদের অর্ধেক খাবার দেয়া হয়। রুটির প্যাকেট ছিড়ে একটি করে রুটি, দুধের প্যাকেট কেটে এককাপ করে দুধ ও ডিম কেটে অর্ধেক করে দেয়।

চাঁদখানা সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষার্থী আশা মনি, রাজিয়া আক্তার বলেন, রুটির প্যাকেট থেকে একটি রুটি খেয়ে দেখি রুটিটি শক্ত ও টক। তাই অন্যটি আর খেতে পারিনি।

মাগুড়া ইউনাইটেড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অনন্ত কুমার রায় বলেন, আমাদের বরাদ্দ সঙ্কট, তাই একজনের বরাদ্দ দু’জনকে দিয়ে দেই। এটা করার কোনো নিয়ম আছে কি-না প্রশ্ন করলে তিনি এর কোনো জবাব দেননি।

চাঁদখানা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আনিছুর রহমান ও রফিকুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের অভিযোগ পেয়ে একটি প্যাকেট খুলে দেখি রুটিগুলো শক্ত ও টক হয়ে গেছে। তাই শিক্ষার্থীরা খেতে অনিহা প্রকাশ করেছে।

পুষনা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর অভিভাবক মনোয়ার হোসেন ও সালমা বেগম বলেন, পুষনা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতিনিয়ত নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করা হয়। কয়েকদিন আগে ওই স্কুলে শিক্ষার্থীদের মাঝে পচা ডিম বিতরণ করা হলে আমরা বিষয়টি প্রধান শিক্ষককে অবহিত করি। বাচ্চারা এসব খাবার খেলে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। তাই বিষয়টির তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি।

পুষনা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোর্শেদা বেগম ঘটনার বিষয় স্বীকার করে বলেন, পচা ডিম বিতরণের বিষয়টি কর্তপক্ষকে অবহিত করেছি।

এ সময় প্যাকেটের গায়ে দেখা যায়, স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে তৈরি করা রুটিগুলো নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার নাউতারা ইউনিয়নের তৃপ্তি বেকারি থেকে উৎপাদন করা হয়। ৩০ এপ্রিল দুপুরে ওই বেকারির সামনে গিয়ে দেখা যায়, বেকারিটির সামনে মশা, মাছি ভ্যানভ্যান করছে। একদম গেট সংলগ্ন স্থানে অস্বাস্থ্যকর নোংরা পরিবেশে শিশুদের জন্য তৈরিকৃত রুটিগুলো রাখা হয়েছে।

এ সময় উৎপাদন কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের কাছে গিয়ে দেখা যায়, শ্রমিকদের পরিহিত পোশাকগুলো ময়লা। তারা ভালো করে হাত-মুখ পরিষ্কার না করে কারখানায় কাজ করছেন। কারখানাটির টয়লেটগুলো অপরিষ্কার ও নোংরা।

কারখানাটির মালিক রফিকুল ইসলামের সাথে এসব বিষয়ে কথা বললে তিনি বলেন, আমার কাগজপত্র সব ঠিক আছে, তবে আমার সাথে ওই সংস্থা কোনো চুক্তি করেনি। তারা আমার কাগজপত্র নিয়ে অন্য কারো সাথে চুক্তি করেছে।

কিন্তু প্যাকেটের গায়ে ওই বেকারির নাম থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আমার কাছ থেকে ১০ হাজার প্যাকেট নেয়া হয়, বাকিগুলো কে দেয় আমি জানি না।

রফিকুল ইসলাম আরো বলেন, এগুলো নিয়ে লেখালেখি করলে আমার বাকি টাকা তুলতে সমস্যা হবে। আপনারা দয়া করে এনজিও প্রতিনিধির সাথে কথা বলেন।

সরকারের সাথে চুক্তিবন্ধ এনজিও ইএসডিওর জেলা ম্যানেজার ও প্রকল্পের তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো: সামছুল আলম বলেন, আমরা তৃপ্তি বেকারির সাথেই চুক্তি করেছি।

এরকম নোংরা পরিবেশে উৎপাদিত খাবার কিভাবে শিশুদের খাওয়াচ্ছেন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আপনারা অনেক সিনিয়র সাংবাদিক আপনারা তো জানেন, বিষয়টি নিয়ে নিউজ হলে আগে আমরাই সমস্যায় পড়ব। আমাদের সংশোধনের সুযোগ দেন।

এর আগেও পচা রুটি সরবরাহের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগের রুটিগুলো লালমনিরহাট থেকে নিয়েছিলাম, সমস্যা হওয়ার পর আর নেইনি।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাহমুদা খাতুনের সাথে কথা বলার জন্য তার কার্যালয়ে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তার সাথে মোবাইলফোনে যোগাযোগ করা হয়। স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে নিম্নমানের খাবার সরবরাহের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি ঢাকায় ট্রেনিংয়ে এসেছি। এটি বলেই তিনি লাইন কেটে দেন।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আরিফুর রহমান বলেন, গত কয়েকদিন আগে স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে পচা ডিম সরবরাহ করা হয়েছিল, বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে এটা জেনেছি। আমি বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়গুলো সরেজমিনে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তপক্ষকে অবহিত করব।