সময় যেন থমকে গিয়েছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের পূর্ব পাইকপাড়ার বডিং মাঠে। কোথাও শোনা যাচ্ছিল পুরনো দিনের গল্প, কোথাও আবার নতুন প্রজন্মের স্বপ্নের কথা। বয়সের ব্যবধান ভুলে যেন এক হয়েছিল কয়েক প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের গৌরবময় ১৫০ বছর পূর্তিতে সাবেক-বর্তমান শিক্ষার্থীদের ওই মিলনমেলার আয়োজন করা হয়।
বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দু’ দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য আয়োজন।
‘আলোকিত ১৫০, সুন্দর পৃথিবীর জন্য আমরা’-এই শ্লোগানকে সামনে রেখে বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের সংগঠন অ্যালামনাই অব ব্রাহ্মণবাড়িয়া অন্নদা এক্স স্টুডেন্ট সোসাইটি (আবেশ) এই ঐতিহাসিক আয়োজন করে।
সকাল থেকেই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে একে একে হাজির হন ১৯৫১ ব্যাচ থেকে শুরু করে ২০২৫ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। কারো চোখে ছিল নস্টালজিয়া, কারো মুখে বিস্ময় একই প্রতিষ্ঠানের ছায়ায় দাঁড়িয়ে এত প্রজন্মের সহাবস্থান যেন অন্নদার দীর্ঘ পথচলার জীবন্ত দলিল হয়ে উঠেছিল।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতীয় পতাকা ও আবেশের পতাকা উত্তোলন করেন আবেশের প্রধান পৃষ্ঠপোষক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) সাজ্জাদুল হক, আবেশের সভাপতি ও বিমান বাহিনীর সাবেক গ্রুপ ক্যাপ্টেন সগীর আহমেদ, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: জাকির হোসেন সরকার ও আবেশের সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল হক।
তাদের বক্তব্যে উঠে আসে অন্নদার ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা ও মানবিক শিক্ষার গল্প।
উৎসবের রঙ আরো গাঢ় হয় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত নান্দনিক ডিসপ্লে প্রদর্শনী ও ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলায়। করতালির মধ্য দিয়ে অতীত আর বর্তমান যেন একে অপরকে হাতছানি দেয়। পরে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি শহরের পুরনো পথ ঘুরে অন্নদা প্রাঙ্গণে ফিরে আসে, যেখানে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে উৎসব ছড়িয়ে পড়ে পুরো শহরে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলার বিভিন্ন দফতরের শীর্ষ কর্মকর্তা, বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক, সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা।
দু’ দিনব্যাপী কর্মসূচিতে রয়েছে স্মৃতিচারণা, পুরস্কার বিতরণ, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, আবেশের কার্যক্রমের ভিজ্যুয়াল প্রেজেন্টেশন, বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মাননা, র্যাফেল ড্র ও কৃতি শিক্ষার্থীদের সম্মাননা প্রদান।
১৮৭৫ সালে দানবীর অন্নদা প্রসাদ রায় যে শিক্ষাবীজ রোপণ করেছিলেন, তা আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে। দেড় শতকে অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আত্মপরিচয়ের অংশ, অসংখ্য আলোকিত মানুষের জন্মভূমি।
আয়োজকদের তথ্যমতে, এই ঐতিহাসিক মিলনমেলায় অংশ নিতে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন ব্যাচের তিন হাজার ৩০০ জন সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছেন। এই বিপুল উপস্থিতি প্রমাণ করে সময় বদলালেও অন্নদার সাথে শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক অটুট।
দেড় শতকের স্মৃতি বুকে নিয়ে অন্নদা আজ আবারো বলছে, আলো ছড়ানোই তার উত্তরাধিকার, মানুষ গড়াই তার ইতিহাস।



