কফিনবন্দী হয়ে দীর্ঘ ২৭ দিন পর নিজভূমি সাতক্ষীরায় ফিরলেন লেবাননে ইসরাইলি ড্রোন হামলায় নিহত দুই প্রবাসী শফিকুল ইসলাম ও নাহিদুল ইসলাম।
রোববার (৭ জুন) সকালে তাদের লাশ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহতের স্বজনরা। এ সময় স্বজনদের বুকফাটা কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে আশপাশের পরিবেশ।
এর আগে, শনিবার (৬ জুন) গভীর রাতে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায় দুই প্রবাসীর লাশ। সেখানে সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন মিঠু বলেন, বিমানবন্দরে সরকারের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে লাশ গ্রহণ করেন নিহতদের স্বজনরা। আজ (রোববার) সকালে তাদের লাশ গ্রামের বাড়িতে এসে পৌঁছায়। জোহরের নামাজের পর জানাজা শেষে নিজ নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়।
তিনি আরো বলেন, শফিকুল ইসলামের মৃত্যুতে সবচেয়ে বড় সঙ্কটে পড়েছে তার পরিবার। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী রুমা খাতুন ও দুই কন্যাসন্তানকে রেখে চিরবিদায় নেয়া শফিকুলের অনুপস্থিতিতে পরিবারটি এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। তার বড় মেয়ে মৌ আক্তার বিজ্ঞান বিভাগের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী।
অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে প্যানেল চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন মিঠু বলেন, শফিকুলের উপার্জনেই পুরো পরিবার চলত। তার মৃত্যুর ফলে পরিবারটি চরম সঙ্কটে পড়েছে। পরিবারের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় এবং দুই মেয়ের জীবন গঠনে সরকারের বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন।
আশাশুনির কাদাকাটি গ্রামেও একই চিত্র। মাত্র ২০ বছর বয়সে পরিবারের স্বপ্ন বুকে নিয়ে বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন নাহিদুল ইসলাম। স্বজনদের আশা ছিল বিদেশে কাজ করে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করবেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন অপূর্ণ রেখেই ফিরলেন কফিনবন্দী হয়ে।
লাশ বাড়িতে পৌঁছানোর পর মা-বাবা ও স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। প্রতিবেশীরা শোকাহত পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করলেও কান্না থামানো সম্ভব হয়নি।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রবাসী কল্যাণ সেন্টার, খুলনার সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো: খালেদুর রহমান জানান, লাশ দেশে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরেই দাফন-কাফন বাবদ ৩৫ হাজার টাকার চেক দেয়া হয়েছে।
তিনি আরো জানান, বৈধভাবে বিদেশগামী কর্মীদের জন্য ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড থেকে তিন লাখ টাকা ও জীবনবিমা বাবদ ১০ লাখ টাকা প্রদান করা হবে। ফলে নিহত শফিকুল ইসলাম ও নাহিদুল ইসলাম এবং আহত প্রবাসী শুভজিতের পরিবার নিয়ম অনুযায়ী মোট ১৩ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবে।
তবে অর্থের অঙ্ক যত বড়ই হোক, দুই পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। যে মানুষগুলো জীবিকার সন্ধানে বিদেশে গিয়েছিলেন, তারা আজ কফিনবন্দী হয়ে ফিরেছেন জন্মভূমিতে। তাদের মৃত্যুতে শুধু পরিবার নয়; পুরো সাতক্ষীরা জেলায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
এদিকে দুই প্রবাসীর লাশ বাড়িতে পৌঁছানোর পর শেষবারের মতো তাদের একনজর দেখতে ভিড় করেন আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয়রা। নিহতদের পরিবারের সদস্যরা সরকারের কাছে দ্রুত সব ধরনের সহায়তা ও নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন।
উল্লেখ্য, ১১ মে দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়ে অঞ্চলের জিবদিন এলাকায় নিজ বাসভবনে ইসরাইলি ড্রোন হামলায় নিহত হন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের শফিকুল ইসলাম (৪০) ও আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের নাহিদুল ইসলাম (২০)। নিহতের ২৭ দিন পর সরকারি ব্যবস্থাপনায় তাদের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনা হলো।



