রাঙ্গামাটিতে পাহাড়ধস ও বন্যা, সাজেকে আটকা ৬ শতাধিক পর্যটক

​২০১৭ সালের মতো প্রাণহানি এড়াতে জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও পৌরসভা যৌথভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে মাইকিং করে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বলছে। যদিও বসবাসকারীরা নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে অনীহা প্রকাশ করছেন।

রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি

Location :

Rangamati
পাহাড়ধস
পাহাড়ধস |নয়া দিগন্ত

কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে রাঙ্গামাটি জেলাজুড়ে ভয়াবহ পাহাড়ধস ও বন্যার মতো দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। রাঙ্গামাটি শহর এলাকাসহ সবখানে প্রতিনিয়ত পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে ঘটছে।

পাহাড়ি ঢলের তোড়ে বাঘাইছড়ির কাচালং নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মাস্টারপাড়া, বটতলী, লাইল্যা ঘোনা, বাঘাইহাট ও মাচালংসহ বিস্তীর্ণ নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় পর্যটন কেন্দ্র সাজেকে প্রায় ছয় শতাধিক পর্যটক আটকা পড়েছেন।

বুধবার (৮ জুলাই) পার্বত্য ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলালের রাঙ্গামাটি সফরের কথা রয়েছে।

এদিকে বাঘাইছড়িতে মঙ্গলবার (৭ জুলাই) একজনের পাহাড়ধসে একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং বুধবার সকালে রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের মানিকছড়ি আর্মি ক্যাম্প এলাকায় পাহাড়ধসে প্রায় দুই ঘণ্টা যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল।

তবে এই অতিবৃষ্টির ফলে কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় দীর্ঘ খরা কাটিয়ে কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সবকটি ইউনিট একযোগে সচল করা হয়েছে এবং উৎপাদন বেড়ে ১৪৪ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে।

দুর্যোগপূর্ণ এই পরিস্থিতিতে রাঙ্গামাটি পৌর এলাকার ২৮টি স্থানকে পাহাড়ধসপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বুধবার তবলছড়ি ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ১ নম্বর কর্মচারী কলোনি এলাকায় পাহাড়ের একটি অংশ ধসে দু’টি কাঁচা ঘরের উপর পড়লে ঘরবাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাটি ধসে পড়ার স্থান থেকে মাত্র ২০ ফুট দূরে একটি তিনতলা ভবন থাকায় সেটিসহ আশপাশের বসতিগুলো চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।

শহরের শিমুলতলী, রূপনগর, নতুনপাড়া, যুব উন্নয়ন এলাকা, রিজার্ভ বাজার, ভেদভেদি ও লোকনাথ মন্দির এলাকাসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে এখনো প্রায় ৫০ হাজার মানুষ চরম ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। অতীতে ২০১৭ সালে ভয়াবহ পাহাড়ধসে রাঙ্গামাটিতে সেনা সদস্যসহ ১২০ জন এবং ২০১৮ সালে ১১ জন মারা যান।

​২০১৭ সালের মতো প্রাণহানি এড়াতে জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও পৌরসভা যৌথভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে মাইকিং করে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বলছে। যদিও বসবাসকারীরা নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে অনীহা প্রকাশ করছেন।

সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলায় রাঙ্গামাটি পৌর এলাকায় ১১টিসহ জেলায় মোট ৪১টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে রাঙ্গামাটি, কাপ্তাই ও কাউখালী উপজেলার ১০টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৫০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। বাঘাইছড়িতেও খোলা হয়েছে ৪৬টি আশ্রয়কেন্দ্র।

জেলা প্রশাসক (ডিসি) নাজমা আশরাফী ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কামরুল ইসলাম চৌধুরী জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রশাসনের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সকলকে দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এদিকে, টানা বৃষ্টি কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের (কপাবিকে) জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। তীব্র খরা ও লেকের পানি আশঙ্কাজনকহারে কমে যাওয়ার কারণে বিগত কয়েক মাস ধরে এখানে চরম বিদ্যুৎ বিপর্যয় চলছিল। বাধ্য হয়ে কখনো একটি বা সর্বোচ্চ দু’টি ইউনিট চালু রাখা হয়েছিল। তবে বৃষ্টির সুবাদে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি ঘটায় মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে কেন্দ্রের সবকটি (পাঁচটি) ইউনিট একযোগে চালু করা হয়েছে।

কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান নিশ্চিত করেছেন, পাঁচটি ইউনিট একসাথে চালু হওয়ায় উৎপাদন বেড়ে ১৪৪ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে, যা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়ে দেশের বিদ্যুৎ সঙ্কট মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

কেন্দ্রের কন্ট্রোল রুম সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে কাপ্তাই লেকে পানির স্তর রেকর্ড করা হয়েছে ৭৯.৮৬ ফুট এমএসএল (মিন সি লেভেল), যা এই সময়ের রুলকার্ভ (৮৪.৯৬ ফুট) থেকে কিছুটা কম হলেও উৎপাদন সচল রাখার জন্য পর্যাপ্ত। বর্তমানে ১ ও ২ নম্বর ইউনিট থেকে ৬৪ মেগাওয়াট, ৩ নম্বর থেকে ৩০ মেগাওয়াট এবং ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিট থেকে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। কাপ্তাই লেকে পানির সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ১০৮ ফুট এমএসএল। পাহাড়ি ঢলের এই ধারা অব্যাহত থাকলে লেকের পানির স্তর স্বাভাবিক রূপ নেবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন আরো দীর্ঘস্থায়ী ও সর্বোচ্চ পর্যায়ে (২৪২ মেগাওয়াট) পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা।