ইতালি যাওয়ার পথে লিবিয়ায় জিম্মি সুনামগঞ্জের ১০ তরুণ

পরিবারের সদস্যরা জানান, দালালদের সাথে চুক্তি করে জমি বিক্রি ও দাদন করে লাখ লাখ টাকা জোগাড় করে বিদেশে পাড়ি দেন ওই তরুণরা। কিন্তু ইতালিতে পৌঁছানো তো দূরের কথা, এখন তারা লিবিয়ায় জিম্মি অবস্থায় রয়েছেন।

তৌহিদ চৌধুরী প্রদীপ, সুনামগঞ্জ

Location :

Sunamganj

স্বপ্নের দেশ ইতালি যাওয়ার পথে অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকি নিয়ে লিবিয়ায় মানবপাচার চক্রের কবলে পড়েছেন ১৩ জন তরুণ। তাদের মধ্যে ১০ জনই সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাঁক ইউনিয়নের নাজিমনগর গ্রামের বাসিন্দা। বর্তমানে লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিতে একটি মাফিয়া চক্রের হাতে জিম্মি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা।

পরিবারের সদস্যরা জানান, দালালদের সাথে চুক্তি করে জমি বিক্রি ও দাদন করে লাখ লাখ টাকা জোগাড় করে বিদেশে পাড়ি দেন ওই তরুণরা। কিন্তু ইতালিতে পৌঁছানো তো দূরের কথা, এখন তারা লিবিয়ায় জিম্মি অবস্থায় রয়েছেন। তাদের উদ্ধারে পরিবারের সদস্যরা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, নাজিমনগর গ্রামের ১০ জনসহ মোট ১৩ জন যুবক দালালদের মাধ্যমে অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। এ জন্য প্রত্যেকে প্রায় ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। গত ২৮ জানুয়ারি তারা বাড়ি থেকে রওনা দেন। প্রথমে আবুধাবি, সেখান থেকে কুয়েত এবং পরে মিশর হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছান। তবে ইতালির উদ্দেশ্যে সমুদ্রপথে যাত্রা শুরুর আগেই গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ত্রিপোলিতে একটি মাফিয়া চক্র তাদের জিম্মি করে।

পরিবারের সদস্যরা জানান, গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে জিম্মি করে রেখে তরুণদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হচ্ছে। নির্যাতনের ভিডিও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে মুক্তিপণ দাবি করছে অপহরণকারীরা। ইতোমধ্যে হামজা নামের এক তরুণকে মারধরের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। জিম্মিকারীরা প্রত্যেকের পরিবারের কাছে প্রায় ২৬ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করছে এবং বিকাশের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে বলছে।

জিম্মি থাকা তরুণরা হলেন—নুরু মিয়ার ছেলে জীবন মিয়া (২৫), টুনু মিয়ার ছেলে আব্দুল কাইয়ুম (২৬), ফয়জুন নুরের ছেলে মনিরুল ইসলাম (২৪), শহীদ মিয়ার ছেলে মামুন মিয়া (২৭), রাশিদ মিয়ার ছেলে আতাউর রহমান (২৮), বাচ্ছু মিয়ার ছেলে এনামুল হক (২৬), জলিল মিয়ার ছেলে আতাউর রহমান (২৯), এখলাছ মিয়ার ছেলে আমিনুল ইসলাম (২৫), রাশিদ আলীর ছেলে সফিকুল ইসলাম (৩২), আবুল কাশেমের ছেলে নিলয় মিয়া (২২) এবং নুরু মিয়ার বড় ছেলে ইয়াছিন মিয়া (৩০)। এছাড়া জামালগঞ্জ উপজেলার তেলিয়াপাড়া এলাকার আবুল হামজা, সাচনা গ্রামের আবুল কালাম এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার দোহালিয়া গ্রামের সোহেল মিয়াও তাদের সঙ্গে ছিলেন বলে জানা গেছে।

স্বজনদের অভিযোগ, নাজিমনগর গ্রামের শহীদ মিয়ার স্ত্রী দেলোয়ারা বেগম, তার ছেলে হুমায়ুন কবির ও জামাতা নজরুল ইসলামের মাধ্যমে বিদেশ পাঠানোর জন্য প্রতিজনের সঙ্গে মৌখিক চুক্তি করা হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা করে নেয়া হলেও কেউই ইতালি পৌঁছাতে পারেননি। বর্তমানে তারা লিবিয়ায় মাফিয়া চক্রের হাতে বন্দি অবস্থায় রয়েছেন।

জিম্মি সফিকুল ইসলামের বৃদ্ধ পিতা রাশিদ আলী বলেন, “রোজার দুই দিন পরে ছেলের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল। এরপর আর কোনো যোগাযোগ নেই। অন্যের মোবাইলে শুনি, টাকা না দিলে ছাড়বে না। জায়গা-জমি বিক্রি করে ছেলেকে বিদেশে পাঠাইছিলাম। এখন হাতে কোনো টাকা নেই, কী হবে জানি না।”

জীবন মিয়ার বাবা নুরু মিয়া বলেন, “গ্রামের দেলোয়ারা বেগম, তার ছেলে ও জামাইকে বিশ্বাস করে এত টাকা দিয়েছিলাম। টাকা তো গেলই, এখন ছেলেদের জীবনও চরম ঝুঁকিতে।”

জিম্মি আতাউর রহমানের বড় ভাই হারুন মিয়া বলেন, “অনেক কষ্ট করে টাকা জোগাড় করে দালালকে দিয়েছি। এখন মনে হচ্ছে স্থানীয় দালালরা অন্য দালালকে টাকা না দেওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আমরা জমি-জমা বিক্রি করে আবারও টাকা জোগাড়ের চেষ্টা করছি।”

নাজিমনগর গ্রামের বাসিন্দা ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মুর্শেদ আলম জুয়েল বলেন, “গ্রামের ১০ জনের মধ্যে আমার চাচাতো ভাইয়েরাও জিম্মি রয়েছে। পরিবারের সদস্যরা কান্নাকাটি করছেন। এত টাকা দিয়ে এভাবে অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়া উচিত হয়নি।”

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দেলোয়ারা বেগম বলেন, “আমরা বিদেশে মানুষ পাঠানোর দালালি করি না। আমাদের মেয়ের জামাই কাইয়ুম, কালামসহ আমাদের আত্মীয়রাও তাদের সাথে জিম্মি আছে। আমরাও বিপদে আছি।”

জামালগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বন্দে আলী জানান, ভুক্তভোগী পরিবারের কয়েকজন বিষয়টি মৌখিকভাবে জানিয়েছেন। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুশফিকুন নুর বলেন, বিষয়টি তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছেন। তারা সরকারি নিয়ম না মেনে অবৈধ পথে বিদেশে গেছেন। তবে মানবিক দিক বিবেচনায় লিখিতভাবে জানালে প্রয়োজনীয় খোঁজখবর নেয়া হবে।