আজ ঐতিহাসিক বড়াইবাড়ী দিবস

ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সীমান্তে রক্তঝরা সেই প্রতিরোধের দিন

আজ ১৮ এপ্রিল। ২৬তম ঐতিহাসিক বড়াই বাড়ী দিবস। ২০০১ সালের এই দিনে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার বড়াই বাড়ি সীমান্তে ভারতীয় আধিপত্যবাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে বীরত্ব, আত্মত্যাগ আর সীমান্ত রক্ষার এক অনন্য ইতিহাস রচনা করে স্বাধীন বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বীর সন্তানেরা। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সীমান্তের অতন্ত্র প্রহরীরা আপসহীন—বড়াই বাড়ি তারই এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।

Location :

Kurigram
আজ ঐতিহাসিক বড়াইবাড়ী দিবস: ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সীমান্তে রক্তঝরা সেই প্রতিরোধের দিন
আজ ঐতিহাসিক বড়াইবাড়ী দিবস: ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সীমান্তে রক্তঝরা সেই প্রতিরোধের দিন |নয়া দিগন্ত

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি ও রৌমারী সংবাদদাতা

আজ ১৮ এপ্রিল। ২৬তম ঐতিহাসিক বড়াই বাড়ী দিবস। ২০০১ সালের এই দিনে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার বড়াই বাড়ি সীমান্তে ভারতীয় আধিপত্যবাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে বীরত্ব, আত্মত্যাগ আর সীমান্ত রক্ষার এক অনন্য ইতিহাস রচনা করে স্বাধীন বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বীর সন্তানেরা। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সীমান্তের অতন্ত্র প্রহরীরা আপসহীন—বড়াই বাড়ি তারই এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।

১৮ এপ্রিল। কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার সীমান্তঘেঁষা ছোট্ট গ্রাম বড়াইবাড়ীর জন্য দিনটি শুধুই একটি তারিখ নয়—এটি সাহস, আত্মত্যাগ ও প্রতিরোধের এক রক্তাক্ত স্মৃতি। ২০০১ সালের এই দিনে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) দ্বিপক্ষীয় সীমান্তের ১০৬৭/৩ পিলার অতিক্রম করে বড়াইবাড়ী গ্রামে অতর্কিত হামলা চালায়। সেই আক্রমণ প্রতিহত করতে তৎকালীন বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদস্য ও গ্রামবাসীরা সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

সেই সংঘর্ষে শহীদ হন তিন বীর সেনা সদস্য—৩৩ রাইফেল ব্যাটালিয়নের ল্যান্স নায়েক ওহিদুজ্জামান, সিপাহী মাহফুজার রহমান এবং ২৬ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের সিপাহী আব্দুল কাদের। আহত হন আরো কয়েকজন বিডিআর সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দা।

অন্যদিকে, প্রতিরোধের মুখে ১৬ জন বিএসএফ সদস্য নিহত হয় বলে জানা যায়।

২০০১ সালের সেই ভোরে বড়াইবাড়ী গ্রাম ছিল ইরি-বোরো ধানের মৌসুমের ব্যস্ততায় ঘেরা। কৃষকেরা মাঠে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক তখনই সীমান্ত পেরিয়ে বিএসএফ সদস্যরা গ্রামে প্রবেশ করে হামলা চালায়। মুহূর্তেই নিস্তব্ধতা ভেঙে পড়ে গুলির শব্দ, আগুন আর আতঙ্কে।

গ্রামবাসীরা জানান, হামলাকারীরা নির্বিচারে গুলি চালায় এবং বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে পুড়ে ছাই হয়ে যায় অন্তত ৬৯টি ঘরবাড়ি। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় দুই কোটি টাকা। নারী-শিশুদের আর্তচিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে সীমান্তের বাতাস।

হামলার খবর পেয়ে তৎকালীন বিডিআর সদস্যরা দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ান গ্রামবাসীরাও। সেদিনের প্রতিরোধ শুধু একটি সামরিক জবাব ছিল না, ছিল মাতৃভূমি রক্ষার এক অদম্য অঙ্গীকার।

হাবিলদার আব্দুল গনি, নায়েক নজরুল ইসলাম, ল্যান্স নায়েক আবু বক্কর সিদ্দিক, সিপাহী হাবিবুর রহমান ও সিপাহী জাহিদুর নবীসহ অনেকে আহত হন।

স্থানীয়দের মধ্যেও ছিলেন আহতের সংখ্যা কম নয়—ছবিরন বেওয়া (৮০) ও মোস্তফা মুন্সি (৪৫)সহ আরো অনেকে সেদিন রক্তাক্ত হন।

এলাকাবাসীর ধারণা, সিলেটের পাদুয়ায় পূর্ববর্তী সংঘর্ষের প্রতিশোধ নিতেই বড়াইবাড়ীতে এই বর্বরোচিত আক্রমণ চালানো হয়েছিল। তবে যেকোনো বিশ্লেষণের ঊর্ধ্বে উঠে বড়াইবাড়ীর মানুষ আজও মনে রাখে তাদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের ইতিহাস।

ঘটনার ২৫ বছর পেরিয়ে গেলেও বড়াইবাড়ীর মানুষের মনে সেই দুঃসহ স্মৃতি আজও তাজা। বর্তমানে দুই শতাধিক পরিবার গ্রামটিতে বসবাস করছে। সরকার, রেড ক্রিসেন্ট ও বিভিন্ন এনজিওর সহায়তায় তারা কোনো রকমে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছে। তবে ক্ষতচিহ্ন এখনও রয়ে গেছে মনোজগতে।

কুড়িগ্রাম-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য রুহুল আমিন বলেন, ‘২০০১ সালের ১৮ এপ্রিল বিডিআর ও বিএসএফ’র মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধ সংঘটিত হয়। গ্রামবাসীরাও এতে অংশ নেয়। আমাদের তিনজন বিডিআর শহীদ হন। শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় আমরা প্রতিবছর মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করি। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন বড়াইবাড়ীর ইতিহাস জানতে পারে, সেজন্য একটি স্মৃতিসৌধ স্থাপন করা হয়েছে।’

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি, প্রতিবছর ১৮ এপ্রিল বড়াইবাড়ীতে মিলাদ মাহফিল, দোয়া ও আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হয়। তবে এলাকাবাসীর দাবি—এই দিনটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেয়া হোক এবং সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।

বড়াইবাড়ীর ইতিহাস শুধু একটি সীমান্ত সংঘর্ষের কাহিনি নয়; এটি সাহস, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। রক্তে লেখা সেই দিনের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়—বাংলার মাটি রক্ষায় এ দেশের মানুষ কখনও পিছপা হয়নি, হবেও না।