মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প বিকাশের লক্ষ্যে ৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বিসিক শিল্পনগরী ছয় বছরেও আলোর মুখ দেখেনি। শিল্পকারখানার বদলে বর্তমানে জঙ্গল আর বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে এ শিল্পনগরী।
সিলেট বিভাগের অন্যতম ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র ও চা শিল্পসমৃদ্ধ পর্যটন এলাকা হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গলে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) ২০১২ সালে শহরতলীর উত্তরসুর এলাকায় ২০ একর জমি অধিগ্রহণ করে শিল্পনগরী নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ২০১৬ সালে নির্মাণ শুরু হয়ে ২০১৯ সালে প্রশাসনিক ভবন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোয়ার্টার, পাম্প হাউস, গ্যাস সাবস্টেশন, পুকুর ও পিচঢালা সড়কসহ সব কাজ সম্পন্ন করে। কিন্তু দীর্ঘ ছয় বছর পার হয়ে গেলেও সেখানে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানও গড়ে ওঠেনি।
সরেজমিন দেখা যায়, শিল্পনগরীর ১২২টি প্লটের অধিকাংশই ঝোপঝাড়ে ভরা। পিচঢালা সড়কের দুই পাশে গজিয়েছে ঘাস, লতাপাতা ও গাছপালা। দ্বিতীয় প্রবেশগেটটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় সেটি গাছপালায় ঢেকে গেছে। গ্যাস সাবস্টেশনের সরঞ্জাম ও বিদ্যুৎ ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ রয়েছে। ভবনের ভেতরে পড়ে আছে খোলা যন্ত্রাংশ, মিটারগুলো ঢেকে গেছে আগাছায়। পুরো এলাকাটিতে এখন সাপ, শিয়াল-কুকুর, বনবিড়ালসহ নানা বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। দিনের বেলাতেও সেখানে একা চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানান স্থানীয়রা।
জানা যায়, শিল্পনগরীর ১২২টি প্লটের মধ্যে শুরুর দিকে ৫৬টি বরাদ্দ দেয়া হয়। তবে বরাদ্দপ্রাপ্ত উদ্যোক্তাদের কেউই এখনো কারখানা স্থাপন শুরু করেননি। বরাদ্দ পাওয়া অধিকাংশ উদ্যোক্তা জেলার বাইরের হওয়ায় তাদের তেমন আগ্রহ নেই বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া প্রচার প্রচারণার অভাবে অবশিষ্ট প্লটগুলো পড়ে রয়েছে অবিক্রিত অবস্থায়।
এখানে তিন ধরনের প্লট রয়েছে। এর মধ্যে ৬০০০ স্কয়ার ফুট, ৪৫০০ ফুট এবং রেনডম কিছু প্লট রয়েছে, যেগুলো ৩৮০০ থেকে ৮১০০ স্কয়ার ফুটের। প্রয়োজন মতো তারা উদ্যোক্তা প্লট নিতে পারবেন। প্রতি স্কয়ার ফুটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৯৯ টাকা ৫৪ পয়সা। তবে নতুন করে তিনটি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তারা শীঘ্রই কাজ শুরু করবেন এবং আরো তিনটি প্লটের ব্যাপারে আলোচনা হচ্ছে বলে বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা মো: মুনায়েম ওয়ায়েছ নয়া দিগন্তকে জানান।
স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তা মো: দুলন মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘শ্রীমঙ্গল বাংলাদেশের অন্যতম ব্যবসাবান্ধব উপজেলা। সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে শিল্পনগরী নির্মান করলেও প্রকৃত উদ্যোক্তা তৈরী করতে পারেনি। সহজ শর্তে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের প্লট দিলে এখানে শিল্প বিকশিত হতো।’
শ্রীমঙ্গল ব্যবসায়ী সমিতির কোষাধ্যক্ষ মো: আব্দুল বাছিত নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘এ শিল্পনগরী চালু হলে বেকার তরুণদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং শ্রীমঙ্গলের অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হতো। এখানে জঙ্গল আর পরিত্যক্ত স্থাপনাই চোখে পড়ে।’
স্থানীয় যুবক শ্যামল বলেন, ‘শিল্পনগরী হওয়ার খবরে সবাই খুশি হয়েছিল। আমরা ভেবেছিলাম কলকারখানা হবে, এতে অনেকেরই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। এখন দেখি সারাদিন তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকে।’
নৈশপ্রহরী বিশ্বজিৎ সরকার বলেন, ‘চারদিকে জঙ্গল লেগে গেছে। বিশাল এলাকা একা পাহারা দেয়া অসম্ভব। ট্রান্সফরমার চুরির পর থেকে বিদ্যুৎ নেই। একাধিকবার চোর-ডাকাতের আক্রমনে ঝুঁকিতে আছি।’
এ বিষয়ে শ্রীমঙ্গল বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা মো: মুনায়েম ওয়ায়েছ বলেন, ‘২০১৯ সালে বরাদ্দ দেয়া ৫৬টি প্লটের কোনো উদ্যোক্তা এখনো কাজ শুরু করেননি। জেলা প্রশাসকের সাথে সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শুরু করে বকেয়া পরিশোধ করতে হবে। তারা যদি ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শুরু না করেন, তাহলে বরাদ্দ বাতিল করে নতুন উদ্যোগ নেয়া হবে। এছাড়া নতুন যাদের সাথে কথাবার্তা হচ্ছে তাদেরকে বলা হয়েছে প্লট বরাদ্দ নিলে কাজ শুরু করতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ট্রান্সফরমার চুরির কারণে বিদ্যুৎ সংযোগ বর্তমানে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। পুনঃসংযোগের জন্য পল্লীবিদ্যুৎকে ইতোমধ্যে জানানো হয়েছে এবং গ্যাস সাবস্টেশনের ক্ষয়ক্ষতি হিসাব নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে গ্যাসের ব্যবস্থা করে দিব। এছাড়া আগাছা পরিস্কারের কাজ শীঘ্রই শুরু করা হবে।’



