অবহেলায় রোগীর মৃত্যুর অভিযোগে ইন্টার্নি চিকিৎসকে মারধরের ঘটনায় ইন্টার্নি চিকিৎসকদের লাশ আটকানো, লাশের দাবিতে পরিবারের সদস্যদের সড়ক অবরোধ এবং মৃত মায়ের ছেলেকে কানধরে উঠাবসা করার ঘটনায় তোলপাড় চলছে। শুধু কানধরে উঠাবসাই নয়, পা ধরানো এবং নিজের থুথু খাওয়ানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে রিফাতের সাথে।
শনিবার (১৩ জুন) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ১৩ সেকেন্ডের ওই ফুটেজে দেখা যায় রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একজন কর্মকর্তার রুমে এক যুবককে কানধরে উঠাবসা করানো হচ্ছে। ছয় থেকে ১০ পর্যন্ত গুনতেও দেখা যায়। পরে তার পরিচয় সনাক্ত হয়। তিনি শনিবার ভোরে হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে চিকিৎসায় অবহেলায় মৃত্যু হওয়া নুরুন্নাহার বেগমের ছোট ছেলে রিফাত।
রিফাত বলেন, ‘যে ছবিটি ইন্টার্নি চিকিৎসকরা আমার ভাইরাল করেছে সেটা হাসপাতালের পরিচালকের কক্ষের। সেখানেই আমাকে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কানধরে উঠাবাসা করান। এর আগে পরিচালকের কক্ষের সামনে আরো একবার কানধরে উঠাবসা করান, থুথু খাওয়ায় এবং একজন ইন্টার্নি চিকিৎসকের পা ধরে মাফ চাওয়ায়। এছাড়া আমার কোনো উপায় ছিল না। কারণ মায়ের লাশ প্রয়োজন ছিল আমার। দাফন করতে পারছিলাম না। তারা লাশ দিচ্ছিল না। এটা মানবিক নাকি অমানবিক তা বলার ভাষা আমার নেই। তবে এই ঘটনার বিচার আল্লাহর কাছে রেখেছি। আর রংপুরবাসী ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছেও রাখলাম।’
কানধরে উঠাবসার করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান। তিনি জানান, ঘটনাটি তো অনেক বড় সেটা আপনারা জানেন। ইন্টার্নি চিকিৎসকরা এটা করেছে। ভালোমন্দের বিষয়টি তারা ভালো বলতে পারবেন।
কোন রুমে এটা করা হয়েছে এপ্রশ্নের উত্তরে পরিচালক বলেন, ‘এটা ক্যাম্পাসেরই যে কোনো রুমে হয়েছে। কোন রুমে করল সেটা ইনপর্ন্টেন্ট নয়। তারা এটা করেছে এটাই ইমপরটেন্ট।’
প্রসঙ্গত : শনিবার ভোর ৪টার দিকে নগরীর জুম্মাপাড়া থেকে মাকে হৃদরোগ বিভাগে ভর্তি করিয়েছিলেন রিফাত। কর্তব্যরত ইন্টার্ন চিকিৎসক নাইম বকশি ওয়ার্ডে ভর্তির কাগজপত্র এন্ট্রি না হওয়া পর্যন্ত অক্সিজেন না দেয়ায় ওই ওয়ার্ডে নেয়ার কিছুক্ষন পর মৃত্যু হয় নুরুন্নাহারের। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ডা: নাইমকে মারধর করে রিফাত। এ ঘটনার পর লাশ পরিবারের কাছে না দিয়ে আটকে রেখে আন্দেোলনে নামেন ইন্টার্নরা। তাদের পক্ষ নিয়ে সকাল ১১টা থেকে শিক্ষার্থীরাও জরুরি বিভাগে তালা লাগিয়ে দিলে রোগী ভর্তি বন্ধ হয়ে যায়। বিপাকে পড়েন রোগীরা। অন্যদিকে মায়ের লাশের দাবিতে বেলা ২টা থেকে মেডিক্যাল মোড়ে সড়ক অবরোধ করে রাখেন বিক্ষুব্ধ স্বজনরা। এতে দুইপাশে শত শত যানবাহন আটকে যায়। দুপুর সোয়া ৩টায় পরিচালকের মধ্যস্থতায় ইন্টার্নি চিকিৎসকরা লাশ ফেরত দিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। ধারনা করা হচ্ছে কানধরে উঠাবসা করানোর পর লাশ ফেরত দেয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় চলছে।
এদিকে প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, ঘটনার সময় ইন্টার্ন চিকিৎসক নাইম বকশিকে মারধর করা হয়েছিল। তিনি কানধরে উঠাবসা, পা ধরা, থুথু খাওয়া কোনো ঘটনাতেই ছিলেন না। তাকে একাধিকবার মধ্যস্ততাকারীরারা আসতে বললেও তিনি আন্দোলনে আসেননি। এমনকি মামলা করবেন না বলেও জানান তিনি। অতি উৎসাহী ইন্টার্ন চিকিৎসকরা প্রথম দফায় পরিচালকের কার্যালয়ের কলাপসিবল গেটের সামনে শতশত মানুষের উপস্থিতিতে রিফাতকে পা ধরে মাফ চাওয়ায়, কান ধরে উঠাবসা ও থুথু খাওয়ানোর ঘটনা ঘটায়। এসময় সেখানে হাসপাতালের পরিচালক ও মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ উপস্থিত ছিলেন।
এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন রংপুর জেলা সভাপতি ফখরুল আনাম বেঞ্জু জানান, চিকিৎসরা এতো অমানবিক হবে এটা মানা যায় না। অক্সিজেন না দেয়ায় মায়ের মৃত্যু। ক্ষুব্ধ হয়ে ইন্টার্ন কিৎসককে মারধর। তারা আবার লাশ আটকিয়ে দিলো। পরে কানধরে উঠাবসা করার পর ছেড়ে লাশ দেয়া হল। এটা মানা যায় না। এ ব্যপারে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে যাবে।



