কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কে আবারো ভাঙন

জোয়ারের পানির উচ্চতা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় ভাঙন প্রতিদিনই বাড়ছে। বসানো জিও ব্যাগও পানির চাপে আর স্থায়ীভাবে টিকে থাকতে পারছে না।

হুমায়ুন কবির জুশান, উখিয়া (কক্সবাজার)

Location :

Ukhia
মেরিন ড্রাইভ সড়কে আবারো ভাঙন
মেরিন ড্রাইভ সড়কে আবারো ভাঙন |নয়া দিগন্ত

নিম্নচাপ ও ভারী বৃষ্টিপাতের প্রভাবে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের টেকনাফ অংশে ফের দেখা দিয়েছে ভাঙন। সামুদ্রিক জোয়ারের তীব্র ঢেউয়ের আঘাতে মুন্ডার ডেইল, বাহারছড়া ও শীলখালীর একাধিক অংশ প্লাবিত হয়ে পড়েছে। ধসে পড়ছে পূর্বে স্থাপিত জিও টিউব ব্যাগের বাঁধও। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নির্মিত এই সড়কের রক্ষণাবেক্ষণে নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে আজ প্রশ্ন উঠেছে- কিভাবে মেরিন ড্রাইভকে টেকসই করা যাবে?

সরেজমিনে দেখা গেছে, টেকনাফ অংশে প্রায় দুই কিলোমিটারজুড়ে চারটি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। জিও ব্যাগের বাঁধ একাধিক স্থানে ফুটো হয়ে পানির চাপে ধসে পড়ছে। মুন্ডার ডেইল ঘাটে ভেঙে পড়া ঝাড় গাছ জোয়ারের পানিতে ভেসে এসে পড়ে থাকলেও তা কেটে নিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় শ্রমিকরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ ও শঙ্কা

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য মোহাম্মদ সলিম জানান, জোয়ারের পানির উচ্চতা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় ভাঙন প্রতিদিনই বাড়ছে। বসানো জিও ব্যাগও পানির চাপে আর স্থায়ীভাবে টিকে থাকতে পারছে না।

স্থানীয়রা বলেন, সমুদ্র তীর থেকে অবাধে বালু তোলায় মেরিন ড্রাইভের গোড়ার অংশ দুর্বল হয়ে গেছে। প্রভাবশালীরা অবৈধভাবে বালু তুলে জমি ভরাট করায় মেরিন ড্রাইভের গঠন কাঠামো বিপন্ন হচ্ছে। এর আগেও ২০২৪ সালের আগস্টে পূর্ণিমার জোয়ারের ধাক্কায় একই অংশে ভাঙন দেখা দিয়েছিল। তখন সেনাবাহিনীর ইসিবি (ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন) জরুরি ভিত্তিতে জিও টিউব ব্যাগ দিয়ে মাটি চাপা দিয়ে ভাঙন রোধ করেছিল। কিন্তু সেই ব্যবস্থা যে স্থায়ী ছিল না, তা আবারো প্রমাণিত হলো। বর্তমানে মেরিন ড্রাইভের সম্প্রসারণ কাজ চলছে। পুরো প্রকল্পে টেকসই উন্নয়নের কাজে প্রকৃতির কাছে অনেকটা হার মানতে হয়।

এরপরও স্থানীয়দের দাবি, সমুদ্রের ধারঘেঁষে নির্মিত এই সড়কের রক্ষা কাঠামো আরো আধুনিক ও দীর্ঘস্থায়ী করা জরুরি। তবে আগের মতো শুধু জিও ব্যাগ দিয়ে নয়।

সরেজমিনে আরো দেখা গেছে, প্রযুক্তিনির্ভর গাইড ওয়াল, ওয়েভ ব্রেকার এবং গভীর ভিত্তির স্থাপনা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় এ ধরনের সড়ক নির্মাণে দীর্ঘমেয়াদী ও সমন্বিত উপকূল ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা জরুরি। এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে- পাথরের ব্লক বা ওয়েভ ব্রেকার স্থাপন, নিয়মিত বালু সরবরাহ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা, স্যাটেলাইট ও ড্রোন প্রযুক্তিতে ভাঙন পর্যবেক্ষণ, প্রভাবশালীদের বালু উত্তোলন বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ।

এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ এহসান উদ্দিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভাঙনের খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাচ্ছি। মেরিন ড্রাইভের রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি সেনাবাহিনী দেখে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত অংশের তথ্য সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়েছে।

তিনি আরো জানান, ভাঙন রোধে স্থানীয় প্রশাসনও সমন্বিতভাবে কাজ করছে এবং গাছ কেটে নেয়ার বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। বাংলাদেশের একমাত্র সমুদ্রঘেঁষা সড়ক ‘কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ শুধু পর্যটন নয়, দেশের গর্ব। এই সড়কের বারবার ভাঙন প্রতিরোধে কেবল তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নয়, দরকার বৈজ্ঞানিক ও বাস্তবভিত্তিক টেকসই পরিকল্পনা। সময় এসেছে মেরিন ড্রাইভকে রক্ষা করতে শক্তিশালী পদক্ষেপ নেয়ার, না হলে অদূর ভবিষ্যতে এ সড়ক শুধুই একটি ‘স্মৃতি’ হয়ে থাকবে।