চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার মইজ্যারটেক এলাকায় অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা থেকে মাসিক টোকেন ও দৈনিক হাজিরার নামে ব্যাপক চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বিএনপি নেতা আবছার, যিনি স্থানীয়ভাবে ‘খুনি আবছার’ নামে পরিচিত।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, প্রতি মাসে ২০ থেকে ২২ লাখ টাকা এবং বছরে প্রায় আড়াই কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা নিয়ে এই চাঁদাবাজি বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে।
একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের বন্দর জোনের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) কর্ণফুলী আবু সাঈদ বাকারকে ম্যানেজ করেই এ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতি মাসে ৩ লাখ টাকার চুক্তিতে টিআইকে ম্যানেজ করা হয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক নেতা, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, পুলিশ প্রশাসন ও কিছু সাংবাদিককে মাসোহারা বাবদ মাসে ১০ লাখ টাকারও বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, এই সিন্ডিকেটে আবছারের ছেলে নজিবুল হক শাওন, হোসাইন, সেলিম ও টেম্পো সোলায়মান ও আংকুর মেম্বার সক্রিয়ভাবে জড়িত। শাওনের বিরুদ্ধে একাধিক চাঁদাবাজি ও হত্যা মামলার অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতা সেলিম পেশাদার ছিনতাইকারী হিসেবে পরিচিত এবং তিনি আগেও চাঁদাবাজির মামলায় কারাভোগ করেছেন। টেম্পো সোলায়মানের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজির মামলা রয়েছে। চাঁদাবাজির মামলা আছে আংকুর মেম্বারের বিরুদ্ধেও। এছাড়া আবছারের আরো তিন ছেলে ও তাদের সহযোগীরাও এই সিন্ডিকেটে সক্রিয় বলে জানা গেছে।
মইজ্যারটেক এলাকায় রয়েছে ৭টি সিএনজি ফিলিং স্টেশন। দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা, এমনকি কক্সবাজারের পেকুয়া ও বদরখালী থেকেও প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা সেখানে গ্যাস নিতে আসে। এসব যানবাহনের অধিকাংশেরই নাম্বার প্লেট, ফিটনেস, ইনসুরেন্স কিংবা ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। এই সুযোগকে কেন্দ্র করেই টোকেন বাণিজ্যের বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে।
বর্তমানে বাঁশখালী রুটের প্রতিটি গাড়ি থেকে মাসিক ৮০০ টাকা, মইজ্যারটেক রুটে ৫০০ টাকা এবং পেকুয়া, বদরখালী ও সাতকানিয়া রুটে ২০০ টাকা করে টোকেন ফি আদায় করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি প্রতিদিন ২০ টাকা করে ‘হাজিরা’ও নেয়া হচ্ছে।
ফলে একটি বাঁশখালী রুটের গাড়িকে মাসে মোট ১ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। এতে সাধারণ চালক ও মালিকরা চরম আর্থিক চাপে পড়েছেন।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, গণ-অভ্যুত্থানের আগে শিকলবাহা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও র্যাব-পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী জাহাঙ্গীর আলম এবং তার ছেলে আরাফাতের নির্দেশে মইজ্যারটেক এলাকায় সিএনজি অটোরিকশা থেকে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি চলত। ইউসুফ, হানিফ ও ইমতিয়াজের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রায় ১৭ বছর ধরে এই চাঁদাবাজি পরিচালনা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিআই কর্ণফুলী আবু সাঈদ বাকারের যোগসাজশে একাধিকবার পুনরায় চাঁদাবাজি শুরু করার চেষ্টা করে সেলিম। তখন পুরোপুরি সফল না হলেও ১২ ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠে এই চক্র।
অভিযোগ রয়েছে, আবছার ও তার ছেলে শাওনের নির্দেশে বর্তমানে সেলিমগং নতুন করে সিএনজি অটোরিকশা থেকে টোকেন ও দৈনিক চাঁদা আদায় শুরু করেছে।
এনসিপি নেতা আব্দুল আউয়াল রানা বলেন, মইজ্যারটেকে টোকেনের নামে লাখ লাখ টাকা উঠছে, কিন্তু এই টাকা কোথায় যায়-সেটাই বড় প্রশ্ন। কার ভাগে কত পড়ে-রাজনৈতিক নেতা, মাঠের কর্মী নাকি বড় কোনো সিন্ডিকেট-তা খতিয়ে দেখা জরুরি। প্রশাসনের নীরবতা ও গণমাধ্যমের নিশ্চুপ ভূমিকা জনমনে আরো প্রশ্ন তৈরি করছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার নেতা শাহিদুল ইসলাম সাহেদ বলেন, ‘সাংবাদিকদের উচিত সত্য তুলে ধরা। জনগণের স্বার্থে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া জরুরি।’
টিআই কর্ণফুলী আবু সাঈদ বাকার জানান, ‘আবছার-শাওনের নিয়ন্ত্রণে সিএনজি টোকেন বাণিজ্যের বিষয়টি আমি শুনেছি। এমপি মহোদয় নির্দেশ দিয়েছেন, কোনো ধরনের সিএনজি টোকেনের নামে চাঁদাবাজি চলবে না। আমরা প্রতিদিন অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ সিএনজি অটোরিকশাগুলো আটক করছি। আমাদের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।’
স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসন দ্রুত তদন্ত করে এই চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পরিবহন খাতের এই অবৈধ বাণিজ্য আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।



