রাজস্ব ফাঁকি রোধে বেনাপোল কাস্টমস কঠোর অবস্থানে, কমছে আমদানি

বেনাপোল কাস্টমস হাউসের জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশনা অনুসরণ করে দ্রুত পন্য খালাশ দেয়ার ইচ্ছা থাকলেও সেই নির্দেশনা তারা বাস্তবায়ন করতে পারছে না।

রাশেদুর রহমান রাশু, বেনাপোল (যশোর)

Location :

Jashore
কাস্টম হাউস
কাস্টম হাউস |নয়া দিগন্ত

রাজস্ব ফাঁকি ও মিথ্যা ঘোষণা ঠেকাতে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল কাস্টমস হাউসে আই আরএম টিমের কঠোর নজরদারি ও শতভাগ পণ্যচালান পরীক্ষা জোরদার করা হয়েছে। সন্দেহজনক চালান শতভাগ পরীক্ষা, বিশেষ অভিযান, অতিরিক্ত পণ্য শনাক্ত এবং আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বেশ কিছু অনিয়ম ধরা পড়েছে। কঠোর অবস্থানে রয়েছে কাস্টমস আইআরএম টিম। ফলে একটি চালান পরীক্ষন করতে তিন, চারদিন পর্যন্ত সময় লাগছে। ব্যবসায়ীরা বলছে রাজস্ব ফাঁকি বন্ধের পাশাপাশি বৈধ আমদানিকারকরা যাতে হয়রানি না, সে বিষয়েও কাস্টম সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

তবে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলছে অন্য কথা। হাতে গোনা দুই-একজন হলুদ সাংবাদিকের কারণে বেনাপোল কাস্টম হাউসের ইমেজ নস্ট হচ্ছে। হলুদ সাংবাদিকরা কাস্টমস কর্মকর্তাদের কাছে জোর করে চাদা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে নাম না জানা দুই-একটি পত্রিকা ও ফেসবুকে কর্মকর্তাদের জড়িয়ে মিথ্যা ও বানোয়াট সংবাদ পরিবেশন করে বন্দরের পরিবেশ নষ্ট করছে। ফলে কাস্টমস বাধ্য হয়েই এক একটি পন্য চালান তিন-চারদিন ধরে পরীক্ষণ কার্যক্রম সম্পন্ন করছেন।

বেনাপোল কাস্টমস হাউসের জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশনা অনুসরণ করে দ্রুত পন্য খালাশ দেয়ার ইচ্ছা থাকলেও সেই নির্দেশনা তারা বাস্তবায়ন করতে পারছে না।

বৈধ পণ্য চালান দ্রুত খালাস নিশ্চিতকরণ এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকির অপচেষ্টা রোধে কাস্টমস হাউস বেনাপোল প্রতিনিয়ত সতর্ক ভূমিকা পালন করে আসছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান, জয়েন্ট কমিশনার মো: শরফুদ্দিন মিঞা, আইআরএম টিমের দায়িত্বে থাক সহকারী কমিশনার তওফিকুর রহমান এর নেতৃত্বে নিবিড় তদারকি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের ফলে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ফাঁকির একাধিক সুসংগঠিত অপচেষ্টা নস্যাৎ করা সম্ভব হয়েছে। বিগত তিন মাসে আইআরএম টিমের কড়া নজরদারিতে বিপুল পরিমাণ শুল্ক ফাঁকি দেয়া রাজস্ব উদ্ধার হয়েছে এবং আমদানিকৃত বিভিন্ন পণ্যের চালানে জালিয়াতি ও মারাত্মক অনিয়ম ধরা পড়েছে।

কাস্টমস সূত্র বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে বেনাপোল কাস্টমস হাউসে প্রায় এক হাজার ৮০০ কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়। একই সময়ে বিভিন্ন অভিযানে মিথ্যা ঘোষণা ও ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য আমদানির ১৪টি চালান আটক করো হয়। এসব ঘটনায় প্রায় ৩০ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি ধরা পড়েছে।

রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে চারটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে।

বেনাপোল কাস্টমস সিএন্ডএফ এজেন্ট স্টাফ এ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান বনি বলেন, ‘কাস্টমস আইআরএম টিম যেসব পন্য চালানগুলো পরীক্ষা করেন তা শতভাগই কায়িক পরীক্ষা করে পন্য খালাশ দিয়ে থাকেন। যশোর শহরের এক পত্রিকার সম্পাদক বেশীর ভাগ সময় বেনাপোল প্রতিনিয়ত এসে কাস্টমস ও বন্দর কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জোর করে চাদা আদায় করে থাকে। চাঁদা না দিলে তাদের বিরূদ্ধে মিথ্যা ও বানোয়াট খবর প্রকাশ করে থাকে।’

রাজস্ব ফাঁকি ঠেকাতে গিয়ে ব্যাপক কড়াকড়ির কারণে বেনাপোল দিয়ে আমদানিও কমেছে। কাস্টমসের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেনাপোল দিয়ে ১৫ লাখ ৯১ হাজার ৬৭০ টন পণ্য আমদানি হয়েছিল। আগের অর্থবছরের তুলনায় এক লাখ ২৯ হাজার ৭৯ টন পন্য আমদানি কমে গেছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। বছর শেষে আদায় হয়েছে মাত্র ছয় হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে চার হাজার ৭৩১ কোটি টাকা, অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৪২ শতাংশ কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। একই সময়ে বেনাপোল দিয়ে আমদানি প্রায় এক লাখ ৯৭ হাজার মেট্রিক টন পণ্য কম আমদানি হয়েছে।

আমদানি ও রাজস্ব আদায়ে বড় ধাক্কার পরও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের জন্য ১০ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আগের অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এটি ৭০২ কোটি টাকা কম।

তবে গত অর্থবছরে ছয় হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা আদায়ের পর নতুন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে বেনাপোলকে গত বছরের আদায়ের তুলনায় প্রায় চার হাজার ২৯ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায় করতে হবে।

বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কমিশনার ফাইজুর রহমান জানিয়েছেন, মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নেয়া হয়েছে। সন্দেহজনক চালান শতভাগ পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং কোনো কর্মকর্তা অনিয়মে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।