লবণাক্ততা আর খরা অঞ্চল খুলনার সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় উপজেলা কয়রার বিভিন্ন এলাকায় এখন তরমুজ চাষের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। কোথাও বীজতলা তৈরি, কোথাও বীজ রোপণ, আবার কোথাও সার, পানি ও কীটনাশক প্রয়োগে ব্যস্ত কৃষক-কৃষাণিরা। শীতের হিমেল হাওয়া উপেক্ষা করে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মাঠজুড়ে চলছে এই কর্মযজ্ঞ। অল্প সময়ে বেশি লাভের আশায় সেচের ব্যবস্থা করে পতিত জমিতেও প্রথমবারের মতো তরমুজ চাষে ঝুঁকছেন অনেক কৃষক।
কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, পাঁচ বছর আগেও কয়রার অধিকাংশ এলাকায় আমন ধান কাটার পর জমি অনাবাদি পড়ে থাকত। শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় চাষাবাদের আগ্রহ ছিল না কারো। এখন সেই লবণাক্ত জমিই হয়ে উঠেছে স্বপ্নের ক্ষেত। কম সময়ে বিনিয়োগের দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ লাভের সম্ভাবনায় লবণসহিষ্ণু তরমুজ চাষ দিন দিন কৃষকদের ভরসা হয়ে উঠছে।
সম্প্রতি উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়ন, মহেশ্বরীপুর ইউনিয়ন, আমাদী ইউনিয়নের চণ্ডীপুর, খিরোল, কিনুকাটি, হরিনগরসহ অন্তত ১৫টি গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, বিলজুড়ে যত দূর চোখ যায় শুধু তরমুজের খেত। জমি প্রস্তুতির পর অধিকাংশ মাঠে চলছে বীজ রোপণের কাজ। নারী শ্রমিকরা সারিবদ্ধভাবে বসে মাদা তৈরি করে তাতে বীজ ফেলছেন। কোথাও কোথাও ইতোমধ্যে রোপণ শেষ হয়েছে, সেখানে নিয়মিত পানি দেয়া হচ্ছে। খাল বা পুকুরের জমা পানি সেচযন্ত্রের মাধ্যমে পাইপ দিয়ে খেতে আনা হচ্ছে। মৌসুমি শ্রমিকদেরও দম ফেলার সময় নেই।
হরিনগর বিলের একটি খেতে কাজ করতে থাকা মিনাক্ষী মণ্ডল বলেন, ‘সারাদিন ৪০০ টাকা মজুরিতে কাজ করছি। তরমুজের মৌসুম এলে এই এলাকার নারীরা ঘরের কাজ শেষ করে কয়েক হাজার টাকা আয় করতে পারেন।’
আমাদী গ্রামের কৃষক আবিয়ার গাজী জানান, গত বছর তরমুজ চাষে ব্যাপক লাভ হয়েছিল। কেউ কেউ বিঘা প্রতি এক লাখ টাকারও বেশি লাভ করেন। সেই কারণে এবার তরমুজ চাষে আগ্রহ বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি এ বছর ৩০ বিঘা জমিতে তরমুজের বীজ রোপণ করেছি। খরচ, সার আর বীজের দাম সবই বেশি। শেষ পর্যন্ত কী হয়, সেটাই দেখার বিষয়।’
উপজেলা কৃষি দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কয়রায় তরমুজ চাষ হয়েছিল প্রায় চার হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে। চলতি মৌসুমে সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে আরো বেশি জমিতে তরমুজ আবাদ হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, ধানের তুলনায় তরমুজে লাভের সম্ভাবনা অনেক বেশি। ধান ঘরে তুলতে সময় লাগে অন্তত পাঁচ মাস, আর খরচ বাদ দিয়ে বিঘা প্রতি লাভ হয় সর্বোচ্চ নয় হাজার টাকা। অন্যদিকে তরমুজ চাষে সময় লাগে সর্বোচ্চ আড়াই মাস। বিঘা প্রতি খরচ ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা হলেও ভালো ফলন হলে বিক্রি হয় ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত।
মহারাজপুর এলাকার বিলে আগে বছরে একবার ফসল হতো। এবার প্রথমবারের মতো সেখানে ১২০ একর জমিতে তরমুজের আবাদ হচ্ছে। ওই এলাকার কৃষক মোশারফ হোসেন বলেন, ‘আমনের পর জমি পড়ে থাকত। তরমুজ লাভজনক হওয়ায় এবার প্রথমবার চাষে নেমেছি। এই বিলে বেশির ভাগই নতুন কৃষক।’
কয়রা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তিলক কুমার ঘোষ বলেন, ‘দেশ জুড়ে কয়রা উপজেলার তরমুজের চাহিদা রয়েছে। লবণাক্ততার কারণে একসময় আমন ধান ছাড়া এখানে অন্য কোনো ফসল হতো না। এখন লবণসহিষ্ণু জাতের তরমুজ চাষ কৃষকদের নতুন সম্ভাবনা এনে দিয়েছে। কম বিনিয়োগে বেশি লাভ হওয়ায় আগ্রহ বাড়ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ বছর উৎপাদনও ভালো হবে বলে আশা করছি।’



